সূরা · মাদানী

আল-আনফাল

Al-Anfal · যুদ্ধলব্ধ সম্পদ · ৭৫ আয়াত

الأنفال
100%
সূরা পরিচিতি ও নাযিলের প্রেক্ষাপট

বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করলে অনুমান করা যায়, সম্ভবত এ সমগ্র সূরাটি একটি মাত্র ভাষনের অন্তর্ভুক্ত এবং একই সঙ্গে এ ভাষণটি নাযিল করা হয়। তবে এর কোন কোন আয়াত বদর যুদ্ধ থেকে উদ্ভূত সমস্যার সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও পরে নাযিল হয়ে থাকতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে ভাষণের ধারাবাহিকতায় এগুলোকে উপযুক্ত স্থানে রেখে, এ সমগ্র ভাষণটিকে একটি ধারাবাহিক ভাষণের রূপ দান করা হয়েছে। কিন্তু দু'-তিনটি আলাদা আলাদা ভাষণকে এক সাথে জুড়ে দিয়ে একটি অখণ্ড ভাষনে রূপান্তরিত করা হয়েছে বলে মনে হতে পারে এমন কোন জোড়ের সন্ধান এ সমগ্র ভাষণের কোথাও পাওয়া যাবে না। ঐতিহাসিক পটভূমি এ সূরাটি পর্যালোচনা করার আগে বদরের যুদ্ধ এবং তার সাথে সম্পর্কিত অবস্থা ও ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। নবী (সা.) তাঁর দাওয়াতের প্রথম দশ-বারো বছর মক্কা মুয়াযময়ায় অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তাঁর দাওয়াত যথেষ্ট পরিপক্বতা ও স্থিতিশীলতা অর্জন করেছিল। কারণ এর পেছনে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী দাওয়াতের পতাকাবাহী উন্নত চরিত্র ও বিশাল হৃদয়বৃত্তির অধিকারী এক জ্ঞানী পুরুষ। তিনি নিজের ব্যক্তিসত্তার সমস্ত যোগ্যতা ও সামর্থ্য এ কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর কার্যধারা থেকে এ সত্যটি পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, এ আন্দোলনকে তার সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দেবার জন্য তিনি দৃঢ়সংকল্প। এ লক্ষে উপনীত হবার জন্য পথের যাবতীয় বিপদ আপদ ও সংকট-সমস্যার মোকাবিলায় তিনি সর্বক্ষন প্রস্তুত। অন্যদিকে এ দাওয়াতের মধ্যে ছিল এমন এক অদ্ভুত ও তীব্র আকর্ষণী ক্ষমতা যে, হৃদয়-মস্তিষ্কের গভীরে তার অনুপ্রবেশ কার্য চলছিল দ্রুত ও অপ্রতিহত গতিতে। মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকার এবং হিংসা ও সংকীর্ণ স্বার্থপ্রীতির প্রাচীন তার পথ রোধ করতে পারছিল না। এ কারণে আরবের প্রাচীন জাহেলী ব্যবস্থার সমর্থক শ্রেণী প্রথম দিকে একে হালকাভাবে এবং অবজ্ঞার চোখে দেখলেও মক্কী যুগের শেষের দিকে একে একটি গুরুতর বিপদ বলে মনে করেছিল। একে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারা নিজেদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু তখনো পর্যন্ত এ দাওয়াতের মধ্যে কোন কোন দিক দিয়ে বেশ কিছুটা অভাব রয়ে গিয়েছিল। একঃ তখনো একথা পুরোপুরি প্রমাণ হয়নি যে, এমন ধরনের যথেষ্ট সংখ্যক অনুসারী এ দাওয়াতের পতাকা তলে সমবেত হয়েছে যারা শুধু তার অনুগতই নয় বরং তার নীতিকে মনেপ্রাণে ভালও বাসে তাকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে নিজেদের সর্বশক্তি ও সকল উপায় উপকরণ ব্যয় করতে প্রস্তুত এবং এ জন্য নিজেদের সব কিছু কুরবানী করে দিতে, সারা দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে এমন কি নিজেদের প্রিয়তম আত্মীয়তার বাঁধনগুলো কেটে ফেলতে ও উদগ্রীব। যদিও মক্কার ইসলামের অনুসারীরা কুরাইশদের জুলুম-নির্যাতন বরদাশত করে নিজেদের ঈমানের অবিচলতা ও নিষ্ঠা এবং ইসলামের সাথে তাদের অটুট সম্পর্কের পক্ষে বেশ বড় আকারের প্রমাণ পেশ করেছিল, তবুও একথা প্রমাণিত হওয়া তখনো বাকী ছিল যে, ইসলামী আন্দোলন এমন একদল উৎসর্গীত প্রাণ অনুসারী পেয়ে গেছে যারা নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মোকাবিলায় অন্য কোন জিনিসকেই প্রিয়তর মনে করে না। বস্তুত একথা প্রমাণ করার জন্য তখনো অনেক পরীক্ষারও প্রয়োজন ছিল। দুইঃ এ দাওয়াতের আওয়াজ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লেও এর প্রভাবগুলো ছিল চারদিকে বিক্ষিপ্ত ও অসংহত। এ দাওয়াত যে জনশক্তি সংগ্রহ করেছিল তা এলোমেলো অবস্থায় সারাদেশে ছড়িয়ে ছিল। পুরাতন জাহেলী ব্যবস্থার সাথে চূড়ান্ত মোকাবিলা করার জন্য যে ধরনের সামষ্টিক শক্তির প্রয়োজন ছিল, তা সে তখনো অর্জন করেনি। তিনঃ এ দাওয়াত তখনো মাটিতে কোথাও শিকড় গাড়তে পারেনি। তখনো তা কেবল বাতাসেই উড়ে বেড়াচ্ছিল। দেশের অভ্যন্তরে এমন কোন এলাকা ছিল না যেখানে দৃঢ়পদ হয়ে নিজের ভূমিকাকে সুসংহত করে সে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারতো। তখনো পর্যন্ত যেখানেই যে মুসলমান ছিল, কুফর ও শিরকে নিমজ্জিত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তার অবস্থান ছিল ঠিক খালি পেটে গেলা কুইনিনের মত। অর্থাৎ খালি পেটে কুইনিন গিললে পেট তাকে বমি করে উগরে দেবার জন্য সর্বক্ষণ চাপ দিতে থাকে এবং কোথাও তাকে এক দণ্ড তিষ্টাতে দেয় না। চারঃ সে সময় পর্যন্ত এ দাওয়াত বাস্তব জীবনের কার্যাবলী নিজের হাতে পরিচালনা করার সুযোগ পায়নি। তখনো সে তার নিজস্ব সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়নি। নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা রচনাও তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্যান্য শক্তির সাথে তার যুদ্ধ ও সন্ধির কোন ঘটনাই ঘটেনি। তাই যেসব নৈতিক বিধানের ভিত্তিতে এ দাওয়াত সমগ্র দেশ ও সমাজকে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত করতে চাচ্ছিল, তার কোন প্রদর্শনীও করা যায়নি। আর এ দাওয়াতের বানী বাহক ও তার অনুসারীরা যে জিনিসের দিকে সমগ্র দুনিয়াবাসীকে আহবান জানিয়ে আসছিলেন তাকে কার্যকর করার ব্যাপারে তারা নিজেরা কতটুকু নিষ্ঠাবান, এখনো কোন পরীক্ষার মানদণ্ডে যাচাই বাছাই করার পর তার সুস্পষ্ট চেহারাও সামনে আসেনি। মক্কী যুগের শেষ তিন-চার বছরে ইয়াসরেবে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েত থাকে অপ্রতিহত গতিতে। সেখানকার লোকেরা আরবের অন্যান্য এলাকার গোত্রগুলোর তুলনায় অধিকতর সহজে ও নির্দ্বিধায় এ আলো গ্রহণ করতে থাকে। শেষে নবুয়াতের দ্বাদশ বছরে হজ্জের সময় ৭৫ জনের একটি প্রতিনিধি দল রাতের আঁধারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করলো। তারা কেবল ইসলাম গ্রহণই করেননি বরং তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে নিজেদের শহরে স্থান দেয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করলেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের একটি বৈপ্লবিক পটপরিবর্তন। মহান আল্লাহ তাঁর নিজ অনুগ্রহে এ দুর্লভ সুযোগটি দিয়েছিলেন এবং নবী (সা.) ও হাত বাড়িয়ে তা লুফে নিয়েছিলেন। ইয়াসরেববাসীরা নবী(সা.) কে শুধুমাত্র একজন শরণার্থী হিসেবে নয় বরং আল্লাহর প্রতিনিধি এবং নেতা ও শাসক হিসেবেও আহবান করেছিলেন। আর তাঁর অনুসারীদেরকে তারা একটি অপরিচিতি দেশে নিছক মুহাজির হিসেবে বসবাস করার জন্য আহবান জানাচ্ছিলেন না। বরং আরবের বিভিন্ন এলাকায় ও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে যেসব মুসলমান ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তাদের সবাইকে ইয়াসরেবে জমা করে ইয়াসরেবী মুসলমানদের সাথে মিলে একটি সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এভাবে মূলত ইয়াসরেব নিজেকে “মদীনাতুল ইসলাম” তথা ইসলামের নগর হিসেবে উপস্থাপিত করলো। নবী(সা.) তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে সেখানে আরবের প্রথম দারুল ইসলাম গড়ে তুললেন। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের অর্থ কি হতে পারে সে সম্পর্কে মদীনাবাসীরা অনবহিত ছিল না। এর পরিষ্কার অর্থ ছিল, একটি ছোট্ট শহর সারাদেশের উদ্যত তরবারি এবং সমগ্র দেশবাসীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, ও সাংস্কৃতিক বয়কটের মোকাবিলায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কাজেই আকাবার বাইআত গ্রহণ করার সময় সেদিনের সেই রাত্রীকালীন মজলিসে ইসলামের প্রাথমিক সাহায্যকারী (আনসারগণ) এ পরিণাম সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে বুঝেই নবী (সা.) এর হাতে নিজেদের হাত রেখেছিলেন। যখন এ বাইআত অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ঠিক তখনই ইয়াসরেবী প্রতিনিধি দলের সর্বকনিষ্ঠ যুব সদস্য আস’আদ ইবনে যুরারাহ (রা.) উঠে বললেনঃ ----------------------------- “থামো, হে ইয়াসরেব বাসীরা! আমরা একথা জেনে বুঝেই এঁর কাছে এসেছি যে, ইনি আল্লাহর রসূল এবং আজ এখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া মানে হচ্ছে সমগ্র আরববাসীর শত্রুতার ঝুঁকি নেয়া। এর ফলে তোমাদের শিশু সন্তানদেরকে হত্যার করা হবে এবং তোমাদের ওপর তরবারি বর্ষিত হবে। কাজেই যদি তোমাদের এ আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা থাকে তাহলে এঁর দায়িত্ব গ্রহণ করো। আল্লাহ এর প্রতিদান দেবেন। আর যদি তোমরা নিজেদের প্রাণকে প্রিয়তর মনে করে থাকো তাহলে দায়িত্ব ছেড়ে দাও এবং পরিষ্কার ভাষায় নিজেদের অক্ষমতা জানিয়ে দাও। কারণ এ সময় অক্ষমতা প্রকাশ করা আল্লাহর কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য হতে পারে”। প্রতিনিধি দলের আর একজন সদস্য আব্বাস ইবনে উবাদাহ ইবনে নাদলাহ (রা.) একথারই পুনরাবৃত্তি করেন এভাবেঃ ------------------------------- “তোমরা কি জানো, এ ব্যক্তির হাতে কিসের বাইআত করছো? (ধ্বনিঃ হাঁ আমরা জানি) তোমরা এঁর হাতে বাইআত করে সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঝুঁকি নিচ্ছো।কাজেই যদি তোমরা মনে করে থাকো, যখন তোমাদের ধন-সম্পদ ধ্বংসের মুখোমুখি হবে এবং তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হবার আশংকা দেখা দেবে তখন তোমরা এঁকে শত্রুদের হাতে সোপর্দ করে দেবে, তাহলে আজই বরং এঁকে ত্যাগ করাই ভাল। কারণ আল্লাহর কসম, এটা দুনিয়ায় ও আখেরাতের সবখানেই লাঞ্চনার কারণ হবে। আর যদি তোমরা মনে করে থাকো, এ ব্যক্তিকে তোমরা যে, আহবান জানাচ্ছো, নিজেদের ধন-সম্পদ ধ্বংস ও নেতৃস্থানীয় লোকেদের জীবন নাশ সত্ত্বেও তোমরা তা পালন করতে প্রস্তুত থাকবে, তাহলে অবশ্যি তাঁর হাতে আঁকড়ে ধরো। কারণ আল্লাহর কসম, এরই মধ্যে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ”। একথায় প্রতিনিধি দলের সবাই এক বাক্যে বলে উঠলেনঃ ------------------------------------- “আমরা এঁকে গ্রহণ করে আমাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস করতে ও নেতৃস্থানীয় লোকদের নিহত হবার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত”। এ ঘটনার পর সেই ঐতিহাসিক বাইআত অনুষ্ঠিত হয়। ইতিহাসে একে আকাবার দ্বিতীয় বাইআত বলা হয়। অন্যদিকে মক্কাবাসীদের কাছেও এ ঘটনাটির তাৎপর্য ছিল সুবিদিত। ইতিপূর্বে কুরাইশরা মুহাম্মাদ (সা.) এর বিপুল প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও অসাধারণ যোগ্যতার সাথে পরিচিত হয়েছিল এবং এখন সেই মুহাম্মাদই (সা.) যে, একটি আবাস লাভ করতে যাচ্ছিলেন তা তারা বেশ অনুধাবন করতে পারছিল। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামের অনুসারীরা যে একটি সুসংগঠিত দলের আকারে অচিরেই গড়ে উঠবে এবং সমবেত হবে একথাও তারা বুঝতে পারছিল। আর ইসলামের এ অনুসারীরা সংকল্পে কত দৃঢ়, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগে কত অবিচল, এতদিনে সেটা তাদের কাছে অনেকটা পরীক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। এহেন সত্যাভিসারী কাফেলার এ নব উত্থান পুরাতন ব্যবস্থার জন্য মৃত্যুর ঘন্টা স্বরূপ। তাছাড়া মদীনার মত জায়গায় এই মুসলিম শক্তির একত্র সমাবেশ কুরাইশদের জন্য আরো নতুন বিপদের সংকেত দিচ্ছিল। কারণ লোহিত সাগরের কিনারা ধরে ইয়ামন থেকে সিরিয়ার দিকে যে বাণিজ্য পথটি চলে গিয়েছিল তার সংরক্ষিত ও নিরাপদ থাকার ওপর কুরাইশ ও অন্যান্য বড় বড় গোত্রের অর্থনৈতিক জীবন নির্ভরশীল ছিল। আর এটি এখন মুসলমানদের প্রভাবাধীনে চলে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। এ প্রধান বাণিজ্য পথটি দখল করে মুসলমানরা জাহেলী ব্যবস্থার জীবন ধারণ দুর্বিষহ করে তূলতে পারতো। এ প্রধান বাণিজ্য পথের ভিত্তিতে শুধু মাত্র মক্কাবাসীদের যে ব্যবসায় চলতো তার পরিমাণ ছিল বছরে আড়াই লাখ আশরাফী। তায়েফ ও অন্যান্য স্থানের ব্যবসায় ছিল এর বাইরে। কুরাইশরা এ পরিণতির কথা ভালভাবেই জানতো। যে রাতে আকাবার বাইআত অনুষ্ঠিত হলো সে রাতেই এ ঘটনার উড়ো খবর মক্কাবাসীদের কানে পৌঁছে গেলো। আর সাথে সাথেই সেখানে হৈ চৈ শুরু হয় গেলো। প্রথমে তারা চেষ্টা করলো মদীনাবাসীদেরকে নবী (সা.) এর দল থেকে ভাগিয়ে নিতে। তারপর যখন মুসলমানরা একজন দুজন করে মদিনায় হিজরত করতে থাকলো এবং কুরাইশদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গেলো যে, এখন মুহাম্মাদ (সা.) সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে যাবেন তখন তারা এ বিপদকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য সর্বশেষ উপায় অবলম্বনে এগিয়ে এলো। রসূলের (সা.) হিজরতের মাত্র কয়েক দিন আগে কুরাইশদের পরামর্শ সভা বসলো। অনেক আলোচনা পর্যালোচনার পর সেখানে স্থির হলো, বনী হাশেম ছাড়া কুরাইশদের প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে লোক বাচাই করা হবে এবং এরা সবাই মিলে মুহাম্মাদ (সা., কে হত্যা করবে। এর ফলে বনী হাশেমের জন্য এ সমস্ত গোত্রের সাথে একাকী লড়াই করা কঠিন হবে। কাজেই এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিশোধের পরিবর্তে রক্ত মূল্য গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানী এবং নবী (সা.) এর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও উন্নত কৌশল অবলম্বনের কারণে তাদের সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে গেলো। ফলে রসূলুল্লাহ (সা., নির্বিঘ্নে মদীনায় পৌঁছে গেলেন। এভাবে হিজরত প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়ে কুরাইশরা মদীনার সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই কে (যাকে হিজরতের আগে মদীনাবাসীরা নিজেদের বাদশাহ বানাবার প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং রসূলের মদীনায় পৌঁছে যাবার এবং আওস ও খাযরাজদের অধিকাংশের ইসলাম গ্রহণের ফলে যার বাড়া ভাতে ছাই পড়ে গিয়েছিল) পত্র লিখলোঃ তোমরা আমাদের লোককে তোমাদের ওখানে আশ্রয় দিয়েছো। আমরা এ মর্মে আল্লাহর কসম খেয়েছি, হয় তোমরা তার সাথে লড়বে বা তাকে সেখান থেকে বের করে দেবে। অন্যথায় আমরা সবাই মিলে তোমাদের ওপর আক্রমণ করবো এবং তোমাদের পুরুষদেরকে হত্যা ও মেয়েদেরকে বাদী বানাবো। কুরাইশদের এ উস্কানির মুখে আবুদুল্লাহ ইবনে উবাই কিছু দুষ্কর্ম করার চক্রান্ত এঁটেছিল। কিন্তু সময় মত নবী (সা.) তার দুষ্কর্ম রুখে দিলেন। তারপর মদীনার প্রধান সাদ ইবনে মুআয উমরাহ করার জন্য মক্কা গেলেন। সেখানে হারম শরীফের দরজার ওপর আবু জেহেল তার সমালোচনা করে বললোঃ ------------------------------- “তোমরা আমাদের ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দেবে এবং তাদেরকে সাহায্য-সহযোগীতা দান করবে আর আমরা তোমাদেরকে অবাধে মক্কায় তাওয়াফ করতে দেবো ভেবেছ? যদি তুমি আবু সফওয়ান তথা উমাইয়া ইবনে খলফের মেহমান না হতে তাহলে তোমাকে এখান থেকে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরে যেতে দিতাম না”। সাদ জবাবে বললেনঃ -------------------------------------- “আল্লাহর কসম, যদি তুমি আমাকে এ কাজে বাধা দাও তাহলে আমি তোমাকে এমন জিনিস থেকে রুখে দেবো, যা তোমার জন্য এর চাইতে অনেক বেশী মারাত্মক। অর্থাৎ মদীনা দিয়ে তোমাদের যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেবো”। অর্থাৎ এভাবে মক্কাবাসীদের পক্ষ থেকে যেন একথা ঘোষণা করে দেয়া হলো যে, বায়তুল্লাহ যিয়ারত করার পথ মুসলমানদের জন্য বন্ধ। আর এর জবাবে মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে বলা হলো, সিরিয়ার সাথে বাণিজ্য করার পথ ইসলাম বিরোধীদের জন্য বিপদসংকুল। আসলে সে সময় মুসলমানদের জন্য উল্লেখিত বাণিজ্য পথের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব মজবুত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায় ছিল না। কারণ এ পথের সাথে কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রগুলোর স্বার্থ বিজড়িত ছিল। ফলে এর ওপর মুসলমানদের কৃতিত্ব বেশী মজবুত হলে তারা ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে নিজেদের শত্রুতামূলক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে বলে আশা করা যায়। কাজেই মদীনায় পৌছার সাথে সাথেই নবী (সা.) সদ্যজাত ইসলামী সমাজে প্রাথমিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান ও মদীনার ইহুদী অধিবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করার পর সর্বপ্রথম এ বাণিজ্য পথটির প্রতি নজর দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। প্রথমত মদীনা ও লোহিত সাগরের উপকূলের মধ্যবর্তীস্থলে এ বাণিজ্য পথের আশেপাশে যেসব গোত্রের বসতি ছিল তাদের সাথে তিনি আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিলেন। এভাবে তাদেরকে সহযোগিতামূলক মৈত্রী অথবা কমপক্ষে নিরপেক্ষতার চুক্তিতে আবদ্ধ করা ছিল মূল উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে তিনি পূর্ণ সফলতা লাভ করলেন। সর্বপ্রথম নিরপেক্ষতার চুক্তি অনুষ্ঠিত হলো সাগর তীরবর্তী পার্বত্য এলাকার জুহাইনা গোত্রের সাথে। এ গোত্রটির ভূমিকা এ এলাকায় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারপর প্রথম হিজরীর শেষের দিকে চুক্তি অনুষ্ঠিত হলে বনী যামরার সাথে। এ গোত্রটির অবস্থান ছিল ইয়াম্বু ও যুল আশীরার সন্নিহিত স্থানে এটি ছিল প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতার চুক্তি। দ্বিতীয় হিজরীর মাঝামাঝি সময়ে বনী মুদলিজও এ চুক্তিতে শামিল হলো। কারণ এ গোত্রটি ছিল বনী যামরার প্রতিবেশী ও বন্ধু গোত্র। এ ছাড়াও ইসলাম প্রচারের ফলে এ গোত্রগুলোতে ইসলামের সমর্থক ও অনুসারীদের একটি বিরাট গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত কুরাইশদের সওদাগরী কাফেলাগুলোকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার জন্য বাণিজ্য পথের ওপর একের পর এক ছোট ছোট ঝটিকা বাহিনী পাঠাতে থাকলেন। কোন কোন ঝাটিকা বাহিনীর সাথে তিনি নিজেও গেলেন। প্রথম বছর এ ধরনের ৪ টি বাহিনী পাঠানো হলো। মাগাযী (যুদ্ধ ইতিহাস) গ্রন্থগুলো এগুলোকে সারীয় হামযা, সারীয়া, উবাইদা ইবনে হারেস, সারীয়া সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ও গাযওয়াতুল আবওয়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। ১ দ্বিতীয় বছরের প্রথম দিকের মাসগুলোর একই দিকে আরো দুটি আক্রমণ চালানো হলো। মাগাযী গ্রন্থগুলোয় এ দুটিকে গাযওয়া বুওয়াত ও গাযওয়া যুল আশারী নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সমস্ত অভিযানের দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য। এক, এ অভিযানগুলোয় কোন রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি এবং কোন কাফেলা লুণ্ঠিতও হয়নি। এ থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এর মাধ্যমে কুরাইশদেরকে বাতাসের গতি কোন দিকে তা জানিয়ে দেয়াই ছিল আসল উদ্দেশ্য। দুই, এর মধ্য থেকে কোন একটি বাহিনীতেও নবী (সা.) মদীনার একটি লোককেও শামিল করেননি। মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদেরকেই তিনি এসব বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেন। কারণ এর ফলে যদি সংঘর্ষ বাধে তাহলে তা যেন এর সাথে চড়িয়ে পড়ে এ আগুনকে চারদিকে ছাড়িয়ে না দেয়। ওদিকে মক্কাবাসীরাও মদীনার দিকে লুটেরা বাহিনী পাঠাতে থাকে। তাদেরই একটি বাহিনী কুরয ইবনে জাবের আল ফিহরীর নেতৃত্বে একেবারে মদীনার কাছাকাছি এলাকায় হামলা চালিয়ে মদীনাবাসীদের গৃহপালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে কুরাইশরা এ সংঘর্ষের মধ্যে অন্যান্য গোত্রদেরকেও জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাছাড়া তারা কেবল ভয় দেখিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছিল না, লুটতরাজও শুরু করে দিয়েছিল। এ অবস্থায় ২য় হিজরীর শাবান মাসে (৬২৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাস) কুরাইশদের একটি বিরাট বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কার পথে অগ্রসর হয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে জায়গাটি ছিল মদীনাবাসীদের আওতার মধ্য। এ কাফেলার সাথে ছিল প্রায় ৫০ হাজার আশরাফীর সামগ্রী। তাদের সাথে তিরিশ চল্লিশ জনের বেশী রক্ষী ছিল না। যেহেতু পণ্যসামগ্রী ছিল বেশী এবং রক্ষীর সংখ্যা ছিল কম আর আগের অবস্থার কারণে মুসলমানদের কোন শক্তিশালী দলের তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করার আশংকা ছিল অত্যন্ত প্রবল, তাই কাফেলা সরদার আবু সুফিয়ান এ বিপদসংকুল স্থানে পৌঁছেই সাহায্য আনার জন্য কোন এক ব্যক্তিকে মক্কা অভিমুখে পাঠিয়ে দিল। লোকটি মক্কায় পৌঁছেই প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী নিজের উটের কান কেটে ফেললো, তার নাক চিরে দিল, উটের পিঠের আসন উল্টে দিলে এবং নিজের জামা সামনের দিকে ও পিছনের দিকে ছিড়ে ফেলে এই বলে চিৎকার করতে থাকলোঃ ------------------------------- ১.ইসলামের ইতিহাসের পরিভাষায় সীরিয়া বলা হয় এমন ধরনের ছোটখাট বাহিনীকে যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সাহাবীর নেতৃত্বে পাঠিয়েছিলেন, আর যে বাহিনীতে তিনি নিজে গিয়েছিলেন তাকে বলা হয় গাযওয়া। “হে কুরাইশরা! তোমাদের বাণিজ্য কাফেলার খবর শোনো। আবু সুফিয়ানের সাথে তোমাদের যে সম্পদ আছে, মুহাম্মাদ তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে তার পেছনে ধাওয়া করেছে। তোমাদের তা পাবার আশা নেই। সাহায্যের জন্য দৌড়ে চলো! সাহায্যের জন্য দৌড়ে চলো”।! এ ঘোষণা শুনে সারা মক্কার বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেলো। কুরাইশদের বড় বড় সরদাররাই সবাই যুদ্ধের জন্য তৈরী হলো। প্রায় এক হাজার যোদ্ধা রণসাজে সজ্জিত হয়ে পূর্ণ আড়ম্বর ও জাঁক-জমকের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে রওয়ানা হলো। তাদের মধ্যে ছিল ৬শ বর্মধারী এবং একশ জন অশ্বারোহী। নিজেদের কাফেলাকে শুধু নিরাপদে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে আসাই তাদের কাজ ছিল না বরং এই সংগে তারা নিত্য দিনের এ আশংকা ও আতংক বোধকে চিরতরে খতম করে দিতে চাচ্ছিল। মদীনায় এ বিরোধী শক্তির নতুন সংযোজনকে তারা গুড়িয়ে দিতে এবং এর আশপাশের গোত্রগুলোকে এর দূর সন্ত্রস্ত করে তুলতে চাচ্ছিল যার ফলে ভবিষ্যতে এ বাণিজ্য পথটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়ে যায়। নবী (সা.) চলমান ঘটনাবলীর প্রতি সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটই অনুভব করলেন যেন চূড়ান্ত মীমাংসার সময় এসে গেছে। তিনি ভাবলেন এ সময় যদি একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তাহলে ইসলামী আন্দোলন চিরকালের জন্য নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। বরং এরপর এ আন্দোলনের জন্য হয়ত আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আর কোন সুযোগই থাকবে না। মক্কা থেকে হিজরত করে এ নতুন শহরে আসার পর এখনো দু'টি বছরও পার হয়ে যায়নি। মুহাজিররা বিত্ত ও সরঞ্জামহীন, আনসাররা অনভিজ্ঞ, ইহুদী গোত্রগুলো বিরুদ্ধবাদিতায় মুখর খোদ মদীনাতেই মুনাফিক ও মুশরিকদের একটি বিরাট গোষ্ঠী উপস্থিত এবং চারপাশের সমস্ত গোত্র কুরাইশদের ভয়ে ভীত। আর সেই সঙ্গে ধর্মীয় দিক দিয়েও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এ অবস্থায় যদি কুরাইশরা মদীনা আক্রমণ করে, তাহলে মুসলমানদের এ ক্ষুদ্র দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি তারা মদীনা আক্রমণ না করে শুধুমাত্র নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করে বাণিজ্য কাফেলাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এবং মুসলমানরা দমে গিয়ে ঘরের কোনে-হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে, তাহলেও সহসাই মুসলমানদের প্রতিপত্তি এমনভাবে আহত হবে এবং তাদের প্রভাব এত বেশী ক্ষুন্ন হবে, যার ফলে আরবের প্রতিটি শিশুও তাদের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে। সারা দেশে তাদের কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না। তখন চারপাশের সমস্ত গোত্র কুরাইশদের ইঙ্গিতে কাজ করতে থাকবে। মদীনার ইহুদী, মুনাফিক ও মুশরিকরা প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। মদীনায় জীবন ধারণ করাও সে সময় দুঃসাধ্য হয় পড়বে। মুসলমানদের কোন প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকবে না। ফলে তাদের ধন-প্রাণ-ইজ্জত-আব্রুর উপর আক্রমণ চালাতে কেউ ইতস্তত করবেনা। এ কারণে নবী (সা.) দৃঢ় সংকল্প নিলেন যে, বর্তমানে যতটুকু শক্তি-সামর্থ্য আমাদের আছে তাই নিয়েই আমরা বের হয়ে পড়বো। দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকার ও টিকে থাকার ক্ষমতা কার আছে এবং কার নেই ময়দানেই তার ফায়সালা হয়ে যাবে। এ চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবার সংকল্প করেই তিনি আনসার ও মোহাজিরদের একত্র করলেন। তাদের সামনে পরিস্থিতি পরিষ্কার তুলে ধরলেন। একদিকে উত্তরে বাণিজ্য কাফেলা এবং অন্যদিকে দক্ষিণে এগিয়ে আসছে কুরাইশদের সেনাদল। আল্লাহর ওয়াদা, এ দু'টির মধ্য থেকে কোন একটি তোমরা পেয়ে যাবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ বলো, এর মধ্য থেকে কার মোকাবিলায় তোমরা এগিয়ে যেতে চাও? জবাবে বিপুল সংখ্যক সাহাবী মত প্রকাশ করলেন, কাফেলার ওপর আক্রমণ চালানো হোক। কিন্তু নবী (সা.) এর সামনে ছিল অন্য কিছু অভিপ্রায়। তাই তিনি নিজের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন। একথায় মোহাজিরদের মধ্য থেকে মিকদাদ ইবনে আমর (রা.) উঠে বললেনঃ ------------------------------- “হে আল্লাহর রসূল! আপনার রব আপনাকে যেদিকে যাবার হুকুম দিচ্ছেন সেদিকে চলুন। আপনি যেদিকে যাবেন আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা বনী ইসরাঈলের মত একথা বলবো নাঃ যাও, তুমি ও তোমার আল্লাহ দু'জনে লড়াই করো, আমরা তো এখানেই বসে রইলাম। বরং আমরা বলছিঃ চলুন আপনি ও আপনার আল্লাহ দু'জনে লড়ুন আর আমরাও আপনাদের সাথে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করবো। যতক্ষণ আমাদের একটি চোখের তারাও নড়াচড়া করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত।” কিন্তু আনসারদের মতামত না জেনে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভবপর ছিল না। কারণ এ পর্যন্ত যেসব সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল তাতে তাদের সাহায্য গ্রহণ করা হয়নি এবং প্রথম দিন তারা ইসলামকে সমর্থন করার যে শপথ নিয়েছিল তাকে কার্যকর করতে তারা কতটুকু প্রস্তুত তা পরীক্ষা করার এটি ছিল প্রথম সুযোগ। সুতরাং রসূলুল্লাহ (সা.) সরাসরি তাদেরকে সম্বোধন না করে নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। একথায় সা'দ ইবনে মু'আয উঠে বললেন, সম্ভবত আপনি আমাদের সম্বোধন করে বলছেন? জবাব দিলেনঃ হাঁ। একথা শুনে সা'দ বললেনঃ ---------------------------- “আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। আপনি যা কিছু এনেছেন তাকে সত্য বলে ঘোষণা করেছি। আপনার কথা শুনার ও আপনার আনুগত্য করার দৃঢ় শপথ নিয়েছি। কাজেই হে আল্লাহর রসূল! আপনি যা সংকল্প করেছেন তা করে ফেলুন। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন তাহলে আমরাও আপনার সাথে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছনে পড়ে থাকবে না। আপনি কালই আমাদের দুশমনের সাথে যুদ্ধ শুরু করুন। এটা আমাদের কাছে মোটেই অপছন্দনীয় নয়। আমরা যুদ্ধে অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকবো। মোকাবিলায় আমরা সত্যিকার প্রাণ উৎসর্গীতার প্রমাণ দেবো। সম্ভবত আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন কিছু কৃতিত্ব দেখিয়ে দেবেন, যাতে আপনার চোখ শীতল হবে। কাজেই আল্লাহর বরকতের ভরসায় আপনি আমাদের নিয়ে চলুন।" এ আলোচনা ও বক্তৃতার পরে সিদ্ধান্ত হলো, বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে কুরাইশ সেনা দলের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু এটা কোন যেনতেন সিদ্ধান্ত ছিল না। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে যারা যুদ্ধ করতে এগিয়ে এলেন, তাদের সংখ্যা ছিল তিনশ'র কিছু বেশী (৮৬ জন মোহাজির, ৬১ আওস গোত্রের এবং ১৭০ জন খাযরাজ গোত্রের, । এদের মধ্যে মাত্র দু'তিন জনের কাছে ঘোড়া ছিল। আর বাকি লোকদের জন্য ৭০ টির বেশী উট ছিল না। এগুলোর পিঠে তারা তিন চারজন করে পালাক্রমে সওয়ার হচ্ছিলেন। যুদ্ধাস্ত্রও ছিল একেবারেই অপ্রতুল। মাত্র ৬০ জনের কাছে বর্ম ছিল। এ কারণে গুটিকয় উৎসর্গীত প্রাণ মুজাহিদ ছাড়া এ ভয়ংকর অভিযানে শরীক অধিকাংশ মুজাহিদই হৃদয়ে উৎকণ্ঠা অনুভব করছিলেন। তারা মনে করছিলেন, যেন তারা জেনে বুঝে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিছু সুবিধাবাদী ধরনের লোক ইসলামের পরিসরে প্রবেশ করলেও তারা এমন ইসলামের প্রবক্তা ছিল না যাতে ধন-প্রাণের সংশয় দেখা দেয়। তারা এ অভিযানকে নিছক পাগলামী বলে অভিহিত করছিল। তারা মনে করছিল, ধর্মীয় আবেগ-উচ্ছ্বাস এ লোকগুলোকে পাগলে পরিণত করেছে। কিন্তু নবী ও সাচ্চা-সত্যনিষ্ঠা মুমিনগণ একথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এটিই প্রাণ উৎসর্গ করার সময়। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁরা বের হয়ে পড়েছিলেন। তারা সোজা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলেন। এ পথেই কুরাইশদের বাহিনী মক্কা থেকে ধেয়ে আসছিল। অথচ শুরুতে যদি বাণিজ্য কাফেলা লুট করার ইচ্ছা থাকতো, তাহলে উত্তর পশ্চিমের পথে এগিয়ে যাওয়া হতো। ১ রমযান মাসের ১৭ তারিখে বদর নামক স্থানে উভয় পক্ষের মোকাবিলা হলো। নবী (সা.) দেখলেন, তিনজন কাফেরের মোকাবিলায় একজন মুসলমান দাঁড়িয়েছে এবং তাও আবার তারা পুরোপুরি অস্ত্র সজ্জিত নয়। এ অবস্থা দেখে তিনি আল্লাহর সামনে দোয়া করার জন্য দু হাত বাড়িয়ে দিলেন। অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে ও কান্না বিজড়িত স্বরে তিনি দোয়া করতে থাকলেনঃ --------------------------------------- ১) উল্লেখ্য, বদরের যুদ্ধের ব্যাপারে ইতিহাস ও সীরাত লেখকরা যুদ্ধ কাহিনী সংক্রান্ত হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থগুলোয় উদ্ধৃত বর্ণনাসমূহের ওপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু এই বর্ণনাগুলোর বিরাট অংশ কুরআন বিরোধী ও অনির্ভরযোগ্য। শুধুমাত্র ঈমানের কারণেই আমরা বদর যুদ্ধ সংক্রান্ত কুরআনী বর্ণনাকে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য বলে মনে করতে বাধ্য হইনা বরং ঐতিহাসিক দিকে দিয়েও যদি আজ এ যুদ্ধ সংক্রান্ত সবচাইতে নির্ভরযোগ্য কোন বর্ণনা থেকে থাকে, তাহলে তা হচ্ছে এ সূরা আনফাল। কারণ যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই এটি নাযিল হয়েছিল। যুদ্ধে যারা শরীক ছিলেন এবং যুদ্ধের স্বপক্ষের বিপক্ষের সবাই এটি শুনেছিলেন ও পড়েছিলেন। 'নাউযুবিল্লাহ' এর মধ্যে কোন একটি কথাও যদি সত্য ও বাস্তব ঘটনা বিরোধী হতো, তাহলে হাজার হাজার লোক এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতো। “হে আল্লাহ! এই কুরাইশরা এসেছে, তাদের সকল ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা নিয়ে তোমার রসূলকে মিথ্যা প্রমাণ করতে। হে আল্লাহ! এখন তোমার সেই সাহায্য এসে যাওয়া দরকার, যার ওয়াদা তুমি করেছিলে আমার সাথে। হে আল্লাহ! যদি আজ এ মুষ্টিমেয় দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে এ পৃথিবীতে আর কোথাও তোমার ইবাদত করার মত কেউ থাকবে না।" এ যুদ্ধের ময়দানে মক্কার মোহাজিরদের পরীক্ষা ছিল সবচেয়ে কঠিন। তাদের আপন ভাই-চাচা ইত্যাদি তাদের বিরুদ্ধে ময়দানে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারোর বাপ, কারোর ছেলে, কারোর চাচা, কারোর মামা, কারোর ভাই দাঁড়িয়েছিল তার প্রতিপক্ষে। এ যুদ্ধে নিজের কলিজার টুকরার ওপর তরবারী চালাতে হচ্ছিল তাদের। এ ধরনের কঠিন পরীক্ষায় একমাত্র তারাই উত্তীর্ণ হতে পারে, যারা পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা সহকারে হক ও সত্যের সাথে সম্পর্ক জুড়েছ এবং মিথ্যা ও বাতিলের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে পুরোপুরি উদ্যোগী হয়েছে। ওদিকে আনসারদের পরীক্ষাও কিছু কম ছিল না। এতদিন তারা মুসলমানদেরকে শুধুমাত্র আশ্রয় দিয়ে কুরাইশ ও তাদের সহযোগী গোত্রগুলোর শত্রুতার ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু এবার তো তারা ইসলামের সমর্থনে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছিল। এর মানে ছিল, কয়েক হাজার লোকের একটি জনবসতি সমগ্র আরব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেছে। এ ধরনের দুঃসাহস একমাত্র তারাই করতে পারে, যারা সত্য আদর্শের ওপর ঈমান এনে তার জন্য নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত হতে পারে। অবশেষে তাদের অবিচল ঈমান ও সত্যনিষ্ঠা আল্লাহর সাহায্যের পুরষ্কার লাভে সফল হয়ে গেলো। আর নিজেদের সমস্ত অহংকার ও শক্তির অহমিকা সত্ত্বেও কুরাইশরা এ সহায়-সম্বলহীন, জানবাজ সৈনিকদের হাতে পরাজিত হয়ে গেলো। তাদের ৭০ জন নিহত হলো, ৭০ জন বন্দী হলো এবং তাদের সাজ-সরঞ্জামগুলো গনীমতের সামগ্রী হিসেবে মুসলমানদের দখলে এলো। কুরাইশদের যেসব বড় বড় সরদার তাদের মজলিস গুলজার করে বেড়াতো এবং ইসলাম বিরোধী আন্দোলনে যারা সর্বক্ষণ তৎপর থাকতো, তারা এ যুদ্ধে নিহত হলো। এ চূড়ান্ত বিজয় আরবে ইসলামকে একটি উল্লেখযোগ্য শক্তিতে পরিণত করলো। একজন পাশ্চাত্য গবেষক লিখেছেন, “বদর যুদ্ধের আগে ইসলাম ছিল শুধুমাত্র একটি ধর্ম ও রাষ্ট্র। কিন্তু বদর যুদ্ধের পরে তা রাষ্ট্রীয় ধর্মে বরং নিজেই রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেলো।" আলোচ্য বিষয় কুরআনের এ সূরাটিতে এ ঐতিহাসিক যুদ্ধের ঘটনাবলী পর্যালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু দুনিয়ার রাজা-বাদশাহরা যুদ্ধ জয়ের পর যেভাবে নিজেদের সেনাবাহিনীর পর্যালোচনা করে থাকেন, এ পর্যালোচনার ধারাটি তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। মুসলমানরা যাতে তাদের নৈতিক ত্রুটিগুলো দূর করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে পারে, সে উদ্দেশ্যে এখানে সর্বপ্রথম সে সব নৈতিক ত্রুটি নির্দেশ করা হয়েছে। যেগুলো তখনো পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান ছিল। তারপর তাদের জানানো হয়েছে, এ বিজয়ে আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থন কি পরিমাণ ছিল। এর ফলে তারা নিজেদের সাহসিকতা ও শৌর্য-বীর্যের মিথ্যা গরীমায় স্ফীত না হয়ে বরং এ থেকে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্যের শিক্ষা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এরপর যে নৈতিক উদ্দশ্যে মুসলমানদের হক ও বাতিলের এ সংঘাত সৃষ্টি করতে হবে তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। এই সঙ্গে এ সংঘাতে যেসব নৈতিক গুণের সাহায্যে তারা সাফল্য লাভ করতে পারে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তারপর মুনাফিক, মুশরিক ও ইহুদিদের এবং এ যুদ্ধে বন্দি অবস্থায় আনীত লোকদের সম্বোধন করে অত্যন্ত শিক্ষণীয় বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। অতঃপর যুদ্ধের ফলে যেসব সম্পদ দখলে এসেছিল, সেগুলো সম্পর্কে মুসলমানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোকে যেন তারা নিজেদের নয় বরং আল্লাহর সম্পদ মনেকরে আল্লাহ তার মধ্য থেকে তাদের জন্য যতটুকু অংশ নির্ধারিত করেছেন ঠিক ততটুকুই যেন তারা কৃতজ্ঞতা সহকারে গ্রহণ করে নেয় এবং আল্লাহ নিজের কাজের জন্য এবং নিজের গরীব বান্দাদের সাহায্য করার জন্য যতটুকু অংশ নির্দিষ্ট করেছেন, সন্তোষ ও আগ্রহ সহকারে যেন তা মেনে নেয়। এরপর যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কে কতিপয় নৈতিক বিধান দেওয়া হয়েছে। ইসলামী দাওয়াতের এ পর্যায়ে এগুলো ছিল একান্ত জরুরী। এর মাধ্যমে নিজেদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সন্ধির ক্ষেত্রে মুসলমানরা জাহেলী পদ্ধতি থেকে দূরে থাকতে পারবে এবং দুনিয়ার ওপর তাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এ সঙ্গে সারা দুনিয়াবাসী একথা জানতে সক্ষম হবে যে, ইসলাম তার আবির্ভাবের প্রথম দিন থেকেই নৈতিকতার ওপর বাস্তব জীবনের ভিত কায়েম করার যে দাওয়াত দিয়ে আসছে, তার নিজের বাস্তব জীবনেই সে যথার্থই তা কার্যকর করেছে। সবশেষে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক আইনের কতিপয় ধারা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে দারুল ইসলামের মুসলমান অধিবাসীদের আইনগত মর্যাদা, দারুল ইসলামের সীমানার বাইরে অবস্থানকারী মুসলমানদের থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।

:

﴿يَسۡـَٔلُوۡنَكَ عَنِ الۡاَنۡفَالِ‌ؕ قُلِ الۡاَنۡفَالُ لِلّٰهِ وَالرَّسُوۡلِ‌ۚ فَاتَّقُوۡا اللّٰهَ وَاَصۡلِحُوۡا ذَاتَ بَيۡنِكُمۡ‌ وَاَطِيۡعُوۡا اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗۤ اِنۡ كُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِيۡنَ‏﴾

লোকেরা তোমার কাছে গনীমতের মাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে? বলে দাও, “এ গনীমতের মাল তো আল্লাহ‌ ও তাঁর রাসূলের। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরে নাও এবং আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।” [১]

:

﴿ اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الَّذِيۡنَ اِذَا ذُكِرَ اللّٰهُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُهُمۡ وَاِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ اٰيٰتُهٗ زَادَتۡهُمۡ اِيۡمٰنًا وَّعَلٰى رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُوۡنَ‌‌ۖ‌ۚ﴾

সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় [২] এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে।

:

﴿الَّذِيۡنَ يُقِيۡمُوۡنَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰهُمۡ يُنۡفِقُوۡنَؕ‏﴾

তারা নামায কায়েম করে এবং যা কিছু আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে (আমার পথে) খরচ করে।

:

﴿ اُولٰۤٮِٕكَ هُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا‌ؕ لَّهُمۡ دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ وَمَغۡفِرَةٌ وَّرِزۡقٌ كَرِيۡمٌ‌ۚ﴾

এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বিরাট মর্যাদা, ভুলত্রুটির ক্ষমা [৩] ও উত্তম রিযিক।

:

﴿ كَمَاۤ اَخۡرَجَكَ رَبُّكَ مِنۡۢ بَيۡتِكَ بِالۡحَقِّ وَاِنَّ فَرِيۡقًا مِّنَ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ لَكٰرِهُوۡنَۙ‏﴾

(এই গনীমতের মালের ব্যাপারে ঠিক তেমনি অবস্থা দেখা দিচ্ছে যেমন অবস্থা সে সময় দেখা দিয়েছিল যখন) তোমার রব তোমাকে সত্য সহকারে ঘর থেকে বের করে এনেছিলেন এবং মুমিনদের একটি দলের কাছে এটা ছিল বড়ই অসহনীয়।

:

﴿ يُجَادِلُوۡنَكَ فِىۡ الۡحَقِّ بَعۡدَ مَا تَبَيَّنَ كَاَنَّمَا يُسَاقُوۡنَ اِلَى الۡمَوۡتِ وَهُمۡ يَنۡظُرُوۡنَؕ‏﴾

তারা এ সত্যের ব্যাপারে তোমার সাথে ঝগড়া করছিল অথচ তা একেবারে পরিষ্কার হয়ে ভেসে উঠেছিল। তাদের অবস্থা এমন ছিল, যেন তারা দেখছিল তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। [৪]

:

﴿ وَاِذۡ يَعِدُكُمُ اللّٰهُ اِحۡدَى الطَّآٮِٕفَتَيۡنِ اَنَّهَا لَكُمۡ وَتَوَدُّوۡنَ اَنَّ غَيۡرَ ذَاتِ الشَّوۡكَةِ تَكُوۡنُ لَكُمۡ وَيُرِيۡدُ اللّٰهُ اَنۡ يُّحِقَّ الۡحَقَّ بِكَلِمٰتِهٖ وَيَقۡطَعَ دَابِرَ الۡكٰفِرِيۡنَۙ﴾

স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন আল্লাহ‌ তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছিলেন, দু’টি দলের মধ্য থেকে একটি তোমরা পেয়ে যাবে। [৫] তোমরা চাচ্ছিলে, তোমরা দুর্বল দলটি লাভ করবে। [৬] কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, নিজের বাণীসমূহের সাহায্যে তিনি সত্যকে সত্যরূপে প্রকাশিত করে দেখিয়ে দেবেন এবং কাফেরদের শিকড় কেটে দেবেন,

:

﴿ لِيُحِقَّ الۡحَقَّ وَيُبۡطِلَ اٴلۡبَاطِلَ وَلَوۡ كَرِهَ الۡمُجۡرِمُوۡنَ‌ۚ‏﴾

যাতে সত্য সত্য রূপে এবং বাতিল বাতিল হিসেবে প্রমাণিত হয়ে যায়, অপরাধিদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক না কেন। [৭]

:

﴿ اِذۡ تَسۡتَغِيۡثُوۡنَ رَبَّكُمۡ فَاسۡتَجَابَ لَكُمۡ اَنِّىۡ مُمِدُّكُمۡ بِاَلۡفٍ مِّنَ الۡمَلٰۤٮِٕكَةِ مُرۡدِفِيۡنَ﴾

আর সেই সময়ের কথাও স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে ফরিয়াদ করছিলে। জবাবে তিনি বললেন, তোমাদের সাহায্য করার জন্য আমি একের পর এক, এক হাজার ফেরেশতা পাঠাচ্ছি।

:১০

﴿ وَمَا جَعَلَهُ اللّٰهُ اِلَّا بُشۡرٰى وَلِتَطۡمَٮِٕنَّ بِهٖ قُلُوۡبُكُمۡ‌ۚ وَمَا النَّصۡرُ اِلَّا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰهِ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِيۡزٌ حَكِيۡمٌ‏﴾

একথা আল্লাহ‌ তোমাদের শুধুমাত্র এ জন্য জানিয়ে দিলেন যাতে তোমরা সুখবর পাও এবং তোমাদের হৃদয় নিশ্চিন্ততা অনুভব করে। নয়তো সাহায্য যখনই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। অবশ্যই আল্লাহ‌ মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী।

:১১

﴿ اِذۡ يُغَشِّيۡكُمُ النُّعَاسَ اَمَنَةً مِّنۡهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيۡكُمۡ مِّنَ السَّمَآءِ مَآءً لِّيُطَهِّرَكُمۡ بِهٖ وَيُذۡهِبَ عَنۡكُمۡ رِجۡزَ الشَّيۡطٰنِ وَلِيَرۡبِطَ عَلٰى قُلُوۡبِكُمۡ وَيُثَبِّتَ بِهِ الۡاَقۡدَامَؕ‏﴾

আর সেই সময়, যখন আল্লাহ‌ নিজের পক্ষ থেকে তন্দ্রার আকারে তোমাদের জন্য নিশ্চিন্ততা ও নির্ভীকতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন [৮] এবং আকাশ থেকে তোমাদের ওপর পানি বর্ষণ করেছিলেন, যাতে তোমাদের পাক-পবিত্র করা যায়, শয়তান তোমাদের ওপর যে নাপাকী ফেলে দিয়েছিল তা তোমাদের থেকে দূর করা যায়, তোমাদের সাহস যোগানো যায় এবং তার মাধ্যমে তোমাদেরকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। [৯]

:১২

﴿ اِذۡ يُوۡحِىۡ رَبُّكَ اِلَى الۡمَلٰۤٮِٕكَةِ اَنِّىۡ مَعَكُمۡ فَثَبِّتُوۡا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا‌ؕ سَاُلۡقِىۡ فِىۡ قُلُوۡبِ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا الرُّعۡبَ فَاضۡرِبُوۡا فَوۡقَ الۡاَعۡنَاقِ وَاضۡرِبُوۡا مِنۡهُمۡ كُلَّ بَنَانٍؕ‏﴾

আর সেই সময়, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে ইঙ্গিত করেছিলেন এই বলেঃ “আমি তোমাদের সাথে আছি, তোমরা ঈমানদারদেরকে অবিচল রাখো, আমি এখনই এ কাফেরদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে দিচ্ছি। কাজেই তোমরা তাদের ঘাড়ে আঘাত করো এবং প্রতিটি জোড়ে ও গ্রন্থী-সন্ধিতে ঘা মারো।” [১০]

:১৩

﴿ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمۡ شَآقُّوۡا اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ‌ ۚ وَمَنۡ يُّشَاقِقِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ فَاِنَّ اللّٰهَ شَدِيۡدُ الۡعِقَابِ‏﴾

এটা করার কারণ, তারা আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ পোষণ করেছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিদ্রোহ করে, আল্লাহ‌ তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আর আল্লাহর পাকড়াও বড়ই কঠিন। [১১]

:১৪

﴿ذٰلِكُمۡ فَذُوۡقُوۡهُ وَاَنَّ لِلۡكٰفِرِيۡنَ عَذَابَ النَّارِ﴾

-এটা [১২] হচ্ছে তোমাদের শাস্তি, এখন এর মজা উপভোগ কর। আর তোমাদের জানা উচিত, সত্য অস্বীকারকারীদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব।

:১৫

﴿ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا لَقِيۡتُمُ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا زَحۡفًا فَلَا تُوَلُّوۡهُمُ الۡاَدۡبَارَ﴾

হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা একটি সেনাবাহিনীর আকারে কাফেরদের মুখোমুখি হও, তখন তাদের মোকাবিলায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না।

:১৬

﴿وَمَنۡ يُّوَلِّهِمۡ يَوۡمَٮِٕذٍ دُبُرَهٗۤ اِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ اَوۡ مُتَحَيِّزًا اِلٰى فِئَةٍ فَقَدۡ بَآءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَمَاۡوٰٮهُ جَهَنَّمُ‌ؕ وَبِئۡسَ الۡمَصِيۡرُ‏﴾

যে ব্যক্তি এ অবস্থায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, সে আল্লাহর গযবে ঘেরাও হয়ে যাবে। তার আবাস হবে জাহান্নাম এবং ফিরে যাবার জন্য তা বড়ই খারাপ জায়গা। [১৩] তবে হ্যাঁ,, যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এমনটি করে থাকলে অথবা অন্য কোন সেনাদলের সাথে যোগ দেবার জন্য করে থাকলে তা ভিন্ন কথা।

:১৭

﴿ فَلَمۡ تَقۡتُلُوۡهُمۡ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ قَتَلَهُمۡ وَمَا رَمَيۡتَ اِذۡ رَمَيۡتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ رَمٰى‌ۚ وَلِيُبۡلِىَ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ مِنۡهُ بَلَآءً حَسَنًا‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِيۡعٌ عَلِيۡمٌ﴾

কাজেই সত্য বলতে কি, তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তোমরা নিক্ষেপ করনি বরং আল্লাহ‌ নিক্ষেপ করেছেন। [১৪] (আর এ কাজে মুমিনদের হাত ব্যবহার করা হয়েছিল) এ জন্য যে, আল্লাহ‌ মুমিনদেরকে একটি চমৎকার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সফলতার সাথে পার করে দেবেন। অবশ্যি আল্লাহ‌ সবকিছু শুনেন ও জানেন।

:১৮

﴿ ذٰلِكُمۡ وَاَنَّ اللّٰهَ مُوۡهِنُ كَيۡدِ الۡكٰفِرِيۡنَ﴾

এ ব্যাপারটি তো তোমাদের সাথে! আর কাফেরদের সাথে যে আচরণ করা হবে তা হচ্ছে আল্লাহ‌ তাদের কৌশলগুলো দুর্বল করে দেবেন।

:১৯

﴿اِنۡ تَسۡتَفۡتِحُوۡا فَقَدۡ جَآءَكُمُ الۡفَتۡحُ‌ۚ وَاِنۡ تَنۡتَهُوۡا فَهُوَ خَيۡرٌ لَّكُمۡ‌ۚ وَاِنۡ تَعُوۡدُوۡا نَعُدۡ‌ۚ وَلَنۡ تُغۡنِىَ عَنۡكُمۡ فِئَتُكُمۡ شَيۡـًٔا وَّلَوۡ كَثُرَتۡ وَاَنَّ اللّٰهَ مَعَ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ‏﴾

(এ কাফেরদের বলে দাও) যদি তোমরা ফায়সালা চেয়ে থাকো, তাহলে এই নাও ফায়সালা তোমাদের সামনে এসে গেছে। [১৫] এখন যদি ক্ষান্ত হও, তাহলে তো তোমাদের জন্যই ভাল হবে। নয়তো যদি ফিরে আবার সেই বোকামির পুনরাবৃত্তি করো, তাহলে আমিও সেই শাস্তির পুনরাবৃত্তি করবো এবং তোমাদের দলবল যত বেশীই হোক না কেন, তা তোমাদের কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ‌ অবশ্যি মুমিনদের সাথে রয়েছেন।

:২০

﴿ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَطِيۡعُوۡا اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ وَلَا تَوَلَّوۡا عَنۡهُ وَاَنۡتُمۡ تَسۡمَعُوۡنَ‌ۖ‌ۚ‏﴾

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না।

:২১

﴿وَلَا تَكُوۡنُوۡا كَالَّذِيۡنَ قَالُوۡا سَمِعۡنَا وَهُمۡ لَا يَسۡمَعُوۡنَ‌ۚ‏﴾

তাদের মতো হয়ে যেয়োনা, যারা বললো, আমরা শুনেছি অথচ তারা শোনে না। [১৬]

:২২

﴿اِنَّ شَرَّ الدَّوَآبِّ عِنۡدَ اللّٰهِ الصُّمُّ الۡبُكۡمُ الَّذِيۡنَ لَا يَعۡقِلُوۡنَ‏﴾

অবশ্যি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের জানোয়ার হচ্ছে সেই সব বধির ও বোবা লোক, [১৭] যারা বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগায় না।

:২৩

﴿ وَلَوۡ عَلِمَ اللّٰهُ فِيۡهِمۡ خَيۡرًا لَّاَسۡمَعَهُمۡ‌ؕ وَلَوۡ اَسۡمَعَهُمۡ لَتَوَلَّوا وَّهُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ‏﴾

যদি আল্লাহ‌ জানতেন, এদের মধ্যে সামান্য পরিমাণও কল্যাণ আছে তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাদেরকে শুনতে উদ্বুদ্ধ করতেন। (কিন্তু কল্যাণ ছাড়া) যদি তিনি তাদের শুনাতেন তাহলে তারা নির্লিপ্ততার সাথে মুখ ফিরিয়ে নিতো। [১৮]

:২৪

﴿يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا اسۡتَجِيۡبُوۡا لِلّٰهِ وَلِلرَّسُوۡلِ اِذَا دَعَاكُمۡ لِمَا يُحۡيِيۡكُمۡ‌ۚ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ يَحُوۡلُ بَيۡنَ الۡمَرۡءِ وَقَلۡبِهٖ وَاَنَّهٗۤ اِلَيۡهِ تُحۡشَرُوۡنَ‏﴾

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন রসূল তোমাদের এমন জিনিসের দিকে ডাকেন যা জীবন দান করবে। আর জেনে রাখো, আল্লাহ‌ মানুষ ও তার দিলের মাঝখানে আড়াল হয়ে আছেন এবং তোমাদের তাঁর দিকেই সমবেত করা হবে। [১৯]

:২৫

﴿ وَاتَّقُوۡا فِتۡنَةً لَّا تُصِيۡبَنَّ الَّذِيۡنَ ظَلَمُوۡا مِنۡكُمۡ خَآصَّةً‌ۚ وَّاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ شَدِيۡدُ الۡعِقَابِ‏﴾

আর সেই ফিতনা থেকে দূরে থাকো, যার অনিষ্টকারিতা শুধুমাত্র তোমাদের গোনাহগারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। [২০] জেনে রাখো, আল্লাহ‌ কঠোর শাস্তিদাতা।

:২৬

﴿ وَاذۡكُرُوۡۤا اِذۡ اَنۡتُمۡ قَلِيۡلٌ مُّسۡتَضۡعَفُوۡنَ فِىۡ الۡاَرۡضِ تَخَافُوۡنَ اَنۡ يَّتَخَطَّفَكُمُ النَّاسُ فَاَاوٰٮكُمۡ وَاَيَّدَكُمۡ بِنَصۡرِهٖ وَرَزَقَكُمۡ مِّنَ الطَّيِّبٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُوۡنَ﴾

স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন তোমরা ছিলে সামান্য কয়েকজন। পৃথিবীর বুকে তোমাদের দুর্বল মনে করা হতো। লোকেরা তোমাদের খতম করেই দেয় নাকি, এ ভয়ে তোমরা কাঁপতে। তারপর আল্লাহ‌ তোমাদের আশ্রয়স্থল যোগাড় করে দিলেন, নিজের সাহায্য দিয়ে তোমাদের শক্তিশালী করলেন এবং তোমাদের ভাল ও পবিত্র জীবিকা দান করলেন, হয়তো তোমরা শোকরগুজার হবে। [২১]

:২৭

﴿ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَخُوۡنُوۡا اللّٰهَ وَالرَّسُوۡلَ وَتَخُوۡنُوۡۤا اَمٰنٰتِكُمۡ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ﴾

হে ঈমানদারগণ! জেনে বুঝে আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না, নিজেদের আমানতসমূহের [২২] খেয়ানত করো না।

:২৮

﴿ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَاۤ اَمۡوٰلُكُمۡ وَاَوۡلٰدُكُمۡ فِتۡنَةٌۙ وَّاَنَّ اللّٰهَ عِنۡدَهٗۤ اَجۡرٌ عَظِيۡمٌ‏﴾

এবং জেনে রাখো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি আসলে পরীক্ষার সামগ্রী। [২৩] আর আল্লাহর কাছে প্রতিদান দেবার জন্য অনেক কিছুই আছে।

:২৯

﴿ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ تَتَّقُوۡا اللّٰهَ يَجۡعَل لَّكُمۡ فُرۡقَانًا وَّيُكَفِّرۡ عَنۡكُمۡ سَيِّاٰتِكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ‌ؕ وَاللّٰهُ ذُوۡ الۡفَضۡلِ الۡعَظِيۡمِ﴾

হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করার পথ অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ‌ তোমাদের কষ্টিপাথর দান করবেন [২৪] এবং তোমাদের পাপগুলো তোমাদের থেকে দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ‌ অতিশয় অনুগ্রহশীল।

:৩০

﴿ وَاِذۡ يَمۡكُرُ بِكَ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا لِيُثۡبِتُوۡكَ اَوۡ يَقۡتُلُوۡكَ اَوۡ يُخۡرِجُوۡكَ‌ؕ وَيَمۡكُرُوۡنَ وَيَمۡكُرُ اللّٰهُ‌ؕ وَاللّٰهُ خَيۡرُ الۡمٰكِرِيۡنَ﴾

সেই সময়ের কথাও স্মরণ করার মত, যখন সত্য অস্বীকারকারীরা তোমার বিরুদ্ধে নানান রকমের চক্রান্ত আঁটছিল। তারা চাচ্ছিল তোমাকে বন্দী করতে। হত্যা করতে বা দেশ ছাড়া করতে। [২৫] তারা নিজেদের কূট-কৌশল প্রয়োগ করে চলছিল, অন্যদিকে আল্লাহও তাঁর কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন আর আল্লাহ‌ সবচেয়ে ভাল কৌশল অবলম্বনকারী।

:৩১

﴿وَاِذَا تُتۡلٰى عَلَيۡهِمۡ اٰيٰتُنَا قَالُوۡا قَدۡ سَمِعۡنَا لَوۡ نَشَآءُ لَقُلۡنَا مِثۡلَ هٰذَٓا‌ۙ اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّاۤ اَسَاطِيۡرُ الۡاَوَّلِيۡنَ﴾

যখন তাদেরকে আমার আয়াত শুনানো হতো, তারা বলতো, “হ্যাঁ, আমরা শুনেছি, আমরা চাইলে এমন কথা আমরাও শুনাতে পারি। এতো সেই সব পুরানো কাহিনী, যা আগে থেকে লোকেরা বলে আসছে।

:৩২

﴿ وَاِذۡ قَالُوۡا اللّٰهُمَّ اِنۡ كَانَ هٰذَا هُوَ الۡحَقَّ مِنۡ عِنۡدِكَ فَاَمۡطِرۡ عَلَيۡنَا حِجَارَةً مِّنَ السَّمَآءِ اَوِ ائۡتِنَا بِعَذَابٍ اَلِيۡمٍ‏﴾

আর সেই কথাও স্মরণ যোগ্য যা তারা বলেছিলঃ “হে আল্লাহ! যদি এটা যথার্থই সত্য হয়ে থাকে এবং তোমার পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের ওপর আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করো অথবা কোন যন্ত্রণাদায়ক আযাব আমাদের ওপর আনো।” [২৬]

:৩৩

﴿ وَمَا كَانَ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمۡ وَاَنۡتَ فِيۡهِمۡ‌ؕ وَمَا كَانَ اللّٰهُ مُعَذِّبَهُمۡ وَهُمۡ يَسۡتَغۡفِرُوۡنَ﴾

তুমিই যখন তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলে তখন আল্লাহ‌ তাদের ওপর আযাব নাযিল করতে চাচ্ছিলেন না। আর এটা আল্লাহর রীতিও নয় যে, লোকেরা ক্ষমা চাইতে থাকবে এবং তিনি তাদেরকে আযাব দেবেন। [২৭]

:৩৪

﴿وَمَا لَهُمۡ اَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللّٰهُ وَهُمۡ يَصُدُّوۡنَ عَنِ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ وَمَا كَانُوۡۤا اَوۡلِيَآءَهٗ‌ ؕ اِنۡ اَوۡلِيَآؤُهٗۤ اِلَّا الۡمُتَّقُوۡنَ وَلٰكِنَّ اَكۡثَرَهُمۡ لَا يَعۡلَمُوۡنَ‏﴾

কিন্তু এখন কেন তিনি তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না যখন তারা মসজিদে হারামের পথ রোধ করেছে? অথচ তারা এ মসজিদের বৈধ মুতাওয়াল্লীও নয়। এর বৈধ মুতাওয়াল্লী হতে পারে একমাত্র তাকওয়াধারীরাই। কিন্তু অধিকাংশ লোক একথা জানে না।

:৩৫

﴿ وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمۡ عِنۡدَ الۡبَيۡتِ اِلَّا مُكَآءً وَّتَصۡدِيَةً‌ؕ فَذُوۡقُوۡا الۡعَذَابَ بِمَا كُنۡتُمۡ تَكۡفُرُوۡنَ‏﴾

বায়তুল্লাহর কাছে তারা কি নামায পড়ে! তারা তো শুধু সিটি দেয় ও তালি বজায়। [২৮] কাজেই তোমরা যে সত্য অস্বীকার করে আসছিলে, তার প্রতিদানে এখন আযাবের স্বাদ গ্রহণ করো। [২৯]

:৩৬

﴿ اِنَّ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا يُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ لِيَصُدُّوۡا عَنۡ سَبِيۡلِ اللّٰهِ‌ؕ فَسَيُنۡفِقُوۡنَهَا ثُمَّ تَكُوۡنُ عَلَيۡهِمۡ حَسۡرَةً ثُمَّ يُغۡلَبُوۡنَ ؕ وَالَّذِيۡنَ كَفَرُوۡۤا اِلٰى جَهَنَّمَ يُحۡشَرُوۡنَۙ‏﴾

যারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে তারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথ রোধ করার জন্য ব্যয় করেছে এবং এখনো আরো ব্যয় করতে থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ প্রচেষ্টা তাদের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারপর তারা বিজিত হবে। আর এ কাফেরদেরকে ঘেরাও করে জাহান্নামের দিকে আনা হবে।

:৩৭

﴿ لِيَمِيۡزَ اللّٰهُ الۡخَبِيۡثَ مِنَ الطَّيِّبِ وَيَجۡعَلَ الۡخَبِيۡثَ بَعۡضَهٗ عَلٰى بَعۡضٍ فَيَرۡكُمَهٗ جَمِيۡعًا فَيَجۡعَلَهٗ فِىۡ جَهَنَّمَ‌ؕ اُولٰٓٮِٕكَ هُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ‏﴾

মূলত আল্লাহ‌ কলুষতাকে পবিত্রতা থেকে ছেঁটে আলাদা করবেন এবং সকল প্রকার কলুষতা মিলিয়ে একত্র করবেন, তারপর এ পুঁটলিটা জাহান্নামে ফেলে দেবেন। মূলত এরাই হবে দেউলিয়া। [৩০]

:৩৮

﴿ قُل لِّلَّذِيۡنَ كَفَرُوۡۤا اِنۡ يَّنۡتَهُوۡا يُغۡفَرۡ لَهُمۡ مَّا قَدۡ سَلَفَ وَاِنۡ يَّعُوۡدُوۡا فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ الۡاَوَّلِيۡنَ﴾

হে নবী! এ কাফেরদের বলে দাও, যদি এখনো তারা ফিরে আসে, তাহলে যা কিছু আগে হয়ে গেছে তা মাফ করা হবে। কিন্তু যদি তারা আগের আচরণের পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে অতীতের জাতিগুলোর সাথে যা কিছু ঘটে গেছে তা সবার জানা।

:৩৯

﴿ وَقَاتِلُوۡهُمۡ حَتّٰى لَا تَكُوۡنَ فِتۡنَةٌ وَّيَكُوۡنَ الدِّيۡنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ‌ۚ فَاِنِ انتَهَوۡا فَاِنَّ اللّٰهَ بِمَا يَعۡمَلُوۡنَ بَصِيۡرٌ‏﴾

হে ঈমানদারগণ! এ কাফেরদের সাথে এমন যুদ্ধ করো, যেন গোমরাহী ও বিশৃংখলা নির্মূল হয়ে যায় এবং দ্বীন পুরোপুরি আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। [৩১]

:৪০

﴿ وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ مَوۡلٰٮكُمۡ‌ؕ نِعۡمَ الۡمَوۡلٰى وَنِعۡمَ النَّصِيۡرُ‏﴾

তারপর যদি তারা ফিতনা থেকে বিরত হয় তাহলে আল্লাহই তাদের আমল দেখবেন। আর যদি তারা না মানে তাহলে জেনে রাখো, আল্লাহ‌ তোমাদের পৃষ্ঠপোষক এবং তিনি সবচেয়ে ভাল সাহায্য-সহায়তা দানকারী।

:৪১

﴿ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا غَنِمۡتُمۡ مِّنۡ شَىۡءٍ فَاَنَّ لِلّٰهِ خُمُسَهٗ وَلِلرَّسُوۡلِ وَلِذِىۡ الۡقُرۡبَىٰ وَالۡيَتٰمٰى وَالۡمَسٰكِيۡنِ وَابۡنِ السَّبِيۡلِۙ اِنۡ كُنۡتُمۡ اٰمَنۡتُمۡ بِاللّٰهِ وَمَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلٰى عَبۡدِنَا يَوۡمَ الۡفُرۡقَانِ يَوۡمَ الۡتَقَى الۡجَمۡعٰنِ‌ؕ وَاللّٰهُ عَلٰى كُلِّ شَىۡءٍ قَدِيۡرٌ﴾

আর তোমরা জেনে রাখো, তোমরা যা কিছু গনীমাতের মাল লাভ করেছো তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ, তাঁর রসূল, আত্মীয়স্বজন, এতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। [৩২] যদি তোমরা ঈমান এনে থাকো আল্লাহর প্রতি এবং ফায়সালার দিন অর্থাৎ উভয় সেনাবাহিনীর সামনা-সামনি মোকাবিলার দিন আমি নিজের বান্দার ওপর যা নাযিল করেছিলাম তার প্রতি, [৩৩] (অতএব সানন্দে এ অংশ আদায় করো) আল্লাহ‌ প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর শক্তিশালী।

:৪২

﴿ اِذۡ اَنۡتُمۡ بِالۡعُدۡوَةِ الدُّنۡيَا وَهُمۡ بِالۡعُدۡوَةِ الۡقُصۡوٰى وَالرَّكۡبُ اَسۡفَلَ مِنۡكُمۡ‌ؕ وَلَوۡ تَوَاعَدتُّمۡ لَاخۡتَلَفۡتُمۡ فِىۡ الۡمِيۡعٰدِ‌ۙ وَلٰكِنۡ لِّيَقۡضِىَ اللّٰهُ اَمۡرًا كَانَ مَفۡعُوۡلاً  ۙلِّيَهۡلِكَ مَنۡ هَلَكَ عَنۡۢ بَيِّنَةٍ وَّيَحۡيٰى مَنۡ حَىَّ عَنۡۢ بَيِّنَةٍ‌ؕ وَاِنَّ اللّٰهَ لَسَمِيۡعٌ عَلِيۡمٌۙ‏﴾

স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন তোমরা উপত্যকার এদিকে ছিলে এবং তারা ছিল অন্যদিকে শিবির তৈরী করে, আর কাফেলা ছিল তোমাদের থেকে নিচের (উপকূল) দিকে। যদি আগেভাগেই তোমাদের ও তাদের মধ্যে মোকাবিলার চুক্তি থাকতো, তাহলে তোমরা অবশ্যি এ সময় পাশ কাটিয়ে যেতে। কিন্তু যা কিছু সংঘটিত হয়েছে তা এ জন্য ছিল যে, আল্লাহ‌ যে বিষয়ের ফায়সালা করে ফেলেছিলেন তা তিনি কার্যকর করবেনই। এভাবে যাকে ধ্বংস হতে হবে সে সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে ধ্বংস হবে এবং যাকে জীবিত থাকতে হবে সে সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে জীবিত থাকবে। [৩৪] অবশ্যি আল্লাহ‌ সবকিছু শোনেন ও সবকিছু জানেন। [৩৫]

:৪৩

﴿ اِذۡ يُرِيۡكَهُمُ اللّٰهُ فِىۡ مَنَامِكَ قَلِيۡلاً‌ؕ وَّلَوۡ اَرٰٮكَهُمۡ كَثِيۡرًا لَّفَشِلۡتُمۡ وَلَتَنٰزَعۡتُمۡ فِىۡ الۡاَمۡرِ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ سَلَّمَ‌ؕ اِنَّهٗ عَلِيۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ﴾

আর স্মরণ করো সে সময়ের কথা, যখন হে নবী, আল্লাহ‌ তোমার স্বপ্নের মধ্যে তাদেরকে সামান্য সংখক দেখাচ্ছিলেন। [৩৬] যদি তিনি তোমাকে তাদের সংখ্যা বেশী দেখিয়ে দিতেন তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলতে এবং যুদ্ধ করার ব্যাপারে ঝগড়া শুরু করে দিতে। কিন্তু আল্লাহই তোমাদের এ থেকে রক্ষা করেছেন। অবশ্যি তিনি মনের অবস্থাও জানেন।

:৪৪

﴿ وَاِذۡ يُرِيۡكُمُوۡهُمۡ اِذِ الۡتَقَيۡتُمۡ فِىۡۤ اَعۡيُنِكُمۡ قَلِيۡلاً وَّيُقَلِّلُكُمۡ فِىۡۤ اَعۡيُنِهِمۡ لِيَقۡضِىَ اللّٰهُ اَمۡرًا كَانَ مَفۡعُوۡلاًؕ وَاِلَى اللّٰهِ تُرۡجَعُ الۡاُمُوۡرُ‏﴾

আর স্মরণ করো, যখন সামনাসামনি যুদ্ধের সময় আল্লাহ‌ তোমাদের দৃষ্টিতে শত্রুদের সামান্য সংখ্যক দেখিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টিতেও তোমাদের কম করে দেখিয়েছেন, যাতে যে বিষয়টি অনিবার্য ছিল তাকে আল্লাহ‌ প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত বিষয় আল্লাহর দিকেই ফিরে যায়।

:৪৫

﴿ يٰۤاَيُّهَا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا لَقِيۡتُمۡ فِئَةً فَاثۡبُتُوۡا وَاذۡكُرُوۡا اللّٰهَ كَثِيۡرًا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ﴾

হে ঈমানদারগণ! যখন কোন দলের সাথে তোমাদের মোকাবিলা হয়, তোমরা দৃঢ়পদ থাকো এবং আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো বেশী বেশী করে। আশা করা যায়, এতে তোমরা সাফল্য অর্জন করবে।

:৪৬

﴿ وَاَطِيۡعُوۡا اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ وَلَا تَنَازَعُوۡا فَتَفۡشَلُوۡا وَتَذۡهَبَ رِيۡحُكُمۡ‌ وَاصۡبِرُوۡا‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصّٰبِرِيۡنَ‌ۚ‏﴾

আর আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না, তাহলে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দেবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তির দিন শেষ হয়ে যাবে। সবরের পথ অবলম্বন করো, [৩৭] অবশ্যি আল্লাহ‌ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন।

:৪৭

﴿ وَلَا تَكُوۡنُوۡا كَالَّذِيۡنَ خَرَجُوۡا مِنۡ دِيٰرِهِمۡ بَطَرًا وَّرِئَآءَ النَّاسِ وَيَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِيۡلِ اللّٰهِ‌ؕ وَاللّٰهُ بِمَا يَعۡمَلُوۡنَ مُحِيۡطٌ‏﴾

আর তোমরা এমন লোকদের মত আচরণ করো না, যারা অহংকার করতে করতে ও লোকদেরকে নিজেদের মাহাত্ম্য দেখাতে দেখাতে ঘর থেকে বের হয়েছে এবং যারা আল্লাহর পথ থেকে (মানুষকে) বিরত রাখে। [৩৮] তারা যা কিছু করছে তা আল্লাহর নাগালের বাইরে নয়।

:৪৮

﴿ وَاِذۡ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيۡطٰنُ اَعۡمَالَهُمۡ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الۡيَوۡمَ مِنَ النَّاسِ وَاِنِّىۡ جَارٌ لَّكُمۡ‌ۚ فَلَمَّا تَرَآءَتِ الۡفِئَتٰنِ نَكَصَ عَلٰى عَقِبَيۡهِ وَقَالَ اِنِّىۡ بَرِىۡٓءٌ مِّنۡكُمۡ اِنِّىۡۤ اَرٰى مَا لَا تَرَوۡنَ اِنِّىۡۤ اَخَافُ اللّٰهَ‌ؕ وَاللّٰهُ شَدِيۡدُ الۡعِقَابِ‏﴾

সেই সময়ের কথা একটু মনে করো, যখন শয়তান এদের কার্যকলাপকে এদের চোখে ঔজ্জ্বল্যময় করে দেখিয়েছিল এবং এদেরকে বলেছিল, আজ তোমাদের ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না এবং আমি তোমাদের সাথে আছি। কিন্তু যখন উভয় বাহিনীর সামানাসামনি মোকাবিলা শুরু হলো তখনই সে পিছনের দিকে ফিরে গেলো এবং বলতে লাগলোঃ তোমাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি এমন কিছু দেখছি যা তোমরা দেখো না। আমি আল্লাহকে ভয় পাচ্ছি। আল্লাহ‌ বড় কঠোর শাস্তিদাতা।

:৪৯

﴿ اِذۡ يَقُوۡلُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَالَّذِيۡنَ فِىۡ قُلُوۡبِهِمۡ مَّرَضٌ غَرَّ هٰٓؤُلَۤاءِ دِيۡنُهُمۡؕ وَمَنۡ يَّتَوَكَّلۡ عَلَى اللّٰهِ فَاِنَّ اللّٰهَ عَزِيۡزٌ حَكِيۡمٌ‏﴾

যখন মুনাফিকরা এবং যাদের দিলে রোগ আছে তারা সবাই বলছিল, এদের দ্বীনই তো এদের মাথা বিগড়ে দিয়েছে। [৩৯] অথচ যদি কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাহলে আল্লাহ‌ অবশ্যি বড়ই পরাক্রান্ত ও জ্ঞানী।

:৫০

﴿وَلَوْ تَرَىٰ إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا ۙ الْمَلَائِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ﴾

৫০) হায়, যদি তোমরা সেই অবস্থা দেখতে পেতে যখন ফেরেশতারা নিহত কাফেরদের রূহ কবয করেছিল৷ তারা তাদের চেহারায় ও পিঠে আঘাত করছিল এবং বলে চলছিল নাও এবং জ্বালাপোড়ার শাস্তি ভোগ করো ৷

:৫১

﴿ ذٰلِكَ بِمَا قَدَّمَتۡ اَيۡدِيۡكُمۡ وَاَنَّ اللّٰهَ لَيۡسَ بِظَلَّامٍ لِّلۡعَبِيۡدِۙ﴾

এ হচ্ছে সেই অপকর্মের প্রতিফল যা তোমরা আগেই করে রেখে এসেছো। নয়তো আল্লাহ‌ তার বান্দাদের ওপর জুলুমকারী নন।”

:৫২

﴿ كَدَاۡبِ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ‌ۙ وَالَّذِيۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ‌ؕ كَفَرُوۡا بِاٰيٰتِ اللّٰهِ فَاَخَذَهُمُ اللّٰهُ بِذُنُوۡبِهِمۡ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ قَوِىٌّ شَدِيۡدُ الۡعِقَابِ﴾

এ ব্যাপারটি তাদের সাথে ঠিক তেমনিভাবে ঘটেছে, যেমন ফেরাউনের লোকদেরও তাদের আগের অন্যান্য লোকদের সাথে ঘটে এসেছে। তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের গোনাহের ওপর আল্লাহ‌ তাদেরকে পাকড়াও করেছেন। আল্লাহ‌ ক্ষমতাশালী এবং কঠোর শাস্তিদাতা।

:৫৩

﴿ ذٰلِكَ بِاَنَّ اللّٰهَ لَمۡ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعۡمَةً اَنۡعَمَهَا عَلٰى قَوۡمٍ حَتّٰى يُغَيِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِهِمۡ‌ۙ وَاَنَّ اللّٰهَ سَمِيۡعٌ عَلِيۡمٌۙ‏﴾

এটা ঠিক আল্লাহর এ রীতি অনুযায়ী হয়েছে, যে রীতি অনুযায়ী তিনি কোন জাতিকে কোন নিয়ামত দান করে ততক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে কোন পরিবর্তন সাধন করেন না যতক্ষন না সেই জাতি নিজেই নিজের কর্মনীতির পরিবর্তন সাধন করে। [৪০] আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও সবকিছু জানেন।

:৫৪

﴿كَدَاۡبِ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ‌ۙ وَالَّذِيۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ‌ؕ كَذَّبُوۡا بِاٰيٰتِ رَبِّهِمۡ فَاَهۡلَكۡنٰهُمۡ بِذُنُوۡبِهِمۡ وَاَغۡرَقۡنَاۤ اٰلَ فِرۡعَوۡنَ‌ۚ وَكُلٌّ كَانُوۡا ظٰلِمِيۡنَ﴾

ফেরাউনের লোকজন ও তাদের আগের জাতিদের সাথে যা কিছু ঘটেছে এ রীতি অনুযায়ীই ঘটেছে। তারা নিজেদের রবের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে। ফলে তাদের গুনাহের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং ফেরাউনের লোক-লস্করকে ডুবিয়ে দিয়েছি। এরা সবাই ছিল জালেম।

:৫৫

﴿ اِنَّ شَرَّ الدَّوَآبِّ عِنۡدَ اللّٰهِ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا فَهُمۡ لَا يُؤۡمِنُوۡنَ﴾

অবশ্যি আল্লাহর কাছে যমীনের ওপর বিচরনশীল জীবের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে তারাই, যারা সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তারপর তারা আর কোন মতেই তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।

:৫৬

﴿ الَّذِيۡنَ عَاهَدتَّ مِنۡهُمۡ ثُمَّ يَنۡقُضُوۡنَ عَهۡدَهُمۡ فِىۡ كُلِّ مَرَّةٍ وَّهُمۡ لَا يَتَّقُوۡنَ‏﴾

(বিশেষ করে) তাদের মধ্য থেকে এমন সব লোক যাদের সাথে তুমি চুক্তি করছো, তারপর তারা প্রত্যেকবার তা ভঙ্গ করে এবং একটুও আল্লাহর ভয় করে না। [৪১]

:৫৭

﴿ فَاِمَّا تَثۡقَفَنَّهُمۡ فِىۡ الۡحَرۡبِ فَشَرِّدۡ بِهِمۡ مَّنۡ خَلۡفَهُمۡ لَعَلَّهُمۡ يَذَّكَّرُوۡنَ‏﴾

কাজেই এ লোকদের যদি তোমরা যুদ্ধের মধ্যে পাও, তাহলে তাদের এমনভাবে মার দেবে যেন তাদের পরে অন্য যারা এমনি ধরনের আচরণ করতে চাইবে, তারা দিশা হারিয়ে ফেলে। [৪২] আশা করা যায়, চুক্তি ভংগকারীদের এ পরিণাম থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে।

:৫৮

﴿ وَاِمَّا تَخَافَنَّ مِنۡ قَوۡمٍ خِيَانَةً فَانۢبِذۡ اِلَيۡهِمۡ عَلٰى سَوَآءٍ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ الۡخَآٮِٕنِيۡنَ‏﴾

আর যদি কখনো কোন জাতির পক্ষ থেকে তোমাদের খেয়ানতের আশঙ্কা থাকে তাহলে তার চুক্তি প্রকাশ্যে তার সামনে ছুড়ে দাও। [৪৩] নিঃসন্দেহে আল্লাহ‌ খেয়ানতকারীকে পছন্দ করেন না।

:৫৯

﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا سَبَقُوۡا‌ؕ اِنَّهُمۡ لَا يُعۡجِزُوۡنَ﴾

সত্য অস্বীকারকারীরা যেন এ ভুল ধারণা পোষণ না করে যে, তারা জিতে গেছে। নিশ্চয়ই তারা আমাকে হারাতে পারবে না।

:৬০

﴿ وَاَعِدُّوۡا لَهُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّةٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَيۡلِ تُرۡهِبُوۡنَ بِهٖ عَدُوَّ اللّٰهِ وَعَدُوَّكُمۡ وَاٰخَرِيۡنَ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ‌ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَهُمُ‌ۚ اللّٰهُ يَعۡلَمُهُمۡ‌ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَىۡءٍ فِىۡ سَبِيۡلِ اللّٰهِ يُوَفَّ اِلَيۡكُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ‏﴾

আর তোমরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া তাদের মোকাবিলার জন্য যোগাড় করে রাখো। [৪৪] এর মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, নিজের শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদেরকে তোমরা চিনো না। কিন্তু আল্লাহ‌ চেনেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু খরচ করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি কখনো জুলুম করা হবে না।

:৬১

﴿ وَاِنۡ جَنَحُوۡا لِلسَّلۡمِ فَاجۡنَحۡ لَهَا وَتَوَكَّلۡ عَلَى اللّٰهِ‌ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِيۡعُ الۡعَلِيۡمُ﴾

আর হে নবী! শত্রু যদি সন্ধি ও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তুমিও সেদিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভর করো। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শুনেন এবং জানেন।

:৬২

﴿ وَاِنۡ يُّرِيۡدُوۡۤا اَنۡ يَّخۡدَعُوۡكَ فَاِنَّ حَسۡبَكَ اللّٰهُ‌ؕ هُوَ الَّذِىۡۤ اَيَّدَكَ بِنَصۡرِهٖ وَبِالۡمُؤۡمِنِيۡنَۙ‏﴾

যদি তারা তোমাকে প্রতারিত করতে চায় তাহলে তোমার জন্য আল্লাহ‌ যথেষ্ট। [৪৫] তিনিই তো নিজের সাহায়তায় ও মুমিনদের মাধ্যমে তোমাকে সমর্থন জানিয়েছেন

:৬৩

﴿وَاَلَّفَ بَيۡنَ قُلُوۡبِهِمۡ‌ؕ لَوۡ اَنۡفَقۡتَ مَا فِىۡ الۡاَرۡضِ جَمِيۡعًا مَّاۤ اَلَّفۡتَ بَيۡنَ قُلُوۡبِهِمۡ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ اَلَّفَ بَيۡنَهُمۡ‌ؕ اِنَّهٗ عَزِيۡزٌ حَكِيۡمٌ‏﴾

এবং মুমিনদের অন্তর পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। তুমি সারা দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ব্যয় করলেও এদের অন্তর জোড়া দিতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ‌ তাদের অন্তর জুড়ে দিয়েছেন। [৪৬] অবশ্যি তিনি বড়ই পরাক্রমশালী ও জ্ঞানী।

:৬৪

﴿ يٰۤاَيُّهَا النَّبِىُّ حَسۡبُكَ اللّٰهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ‏﴾

হে নবী! তোমার জন্য ও তোমার অনুসারী ঈমানদারদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।

:৬৫

﴿ يٰۤاَيُّهَا النَّبِىُّ حَرِّضِ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ عَلَى الۡقِتَالِ‌ؕ اِنۡ يَّكُنۡ مِّنۡكُمۡ عِشۡرُوۡنَ صٰبِرُوۡنَ يَغۡلِبُوۡا مِائَتَيۡنِ‌ۚ وَاِنۡ يَّكُنۡ مِّنۡكُمۡ مِّائَةٌ يَّغۡلِبُوۡۤا اَلۡفًا مِّنَ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا بِاَنَّهُمۡ قَوۡمٌ لَّا يَفۡقَهُوۡنَ‏﴾

হে নবী! মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করো। তোমাদের মধ্যে বিশজন সবরকারী থাকলে তারা দু'শ জনের ওপর বিজয়ী হবে। আর যদি এমনি ধরনের একশ জন থাকে, তাহলে তারা সত্য অস্বীকারকারীদের মধ্য থেকে এক হাজার জনের ওপর বিজয়ী হবে। কারণ তারা এমন এক ধরনের লোক যাদের বোধশক্তি নেই। [৪৭]

:৬৬

﴿ اَلۡـٰٔنَ خَفَّفَ اللّٰهُ عَنۡكُمۡ وَعَلِمَ اَنَّ فِيۡكُمۡ ضَعۡفًا‌ؕ فَاِنۡ يَّكُنۡ مِّنۡكُمۡ مِّائَةٌ صَابِرَةٌ يَّغۡلِبُوۡا مِائَتَيۡنِ‌ؕ وَاِنۡ يَّكُنۡ مِّنۡكُمۡ اَلۡفٌ يَّغۡلِبُوۡۤا اَلۡفَيۡنِ بِاِذۡنِ اللّٰهِؕ وَاللّٰهُ مَعَ الصّٰبِرِيۡنَ﴾

বেশ, এখন আল্লাহ‌ তোমাদের বোঝা হালকা করে দিয়েছেন এবং তিনি জেনেছেন যে, এখনো তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। কাজেই যদি তোমাদের মধ্যে একশ জন সবরকারী হয়, তাহলে তারা দু'শ জনের ওপর এবং এক হাজার লোক এমনি পর্যায়ের হলে, তারা দু'হাজারের ওপর আল্লাহর হুকুমে বিজয়ী হবে। [৪৮] আর আল্লাহ‌ সবরকারীদের সাথে আছেন।

:৬৭

﴿ مَا كَانَ لِنَبِىٍّ اَنۡ يَّكُوۡنَ لَهٗۤ اَسۡرٰى حَتّٰى يُثۡخِنَ فِىۡ الۡاَرۡضِ‌ؕ تُرِيۡدُوۡنَ عَرَضَ الدُّنۡيَا ‌ۖ‌وَاللّٰهُ يُرِيۡدُ الۡاٰخِرَةَ‌ؕ وَاللّٰهُ عَزِيۡزٌ حَكِيۡمٌ‏﴾

সারা দেশে শত্রুদেরকে ভালভাবে পর্যুদস্ত না করা পর্যন্ত কোন নবীর পক্ষে নিজের কাছে বন্দীদের রাখা শোভনীয় নয়। তোমরা চাও দুনিয়ার স্বার্থ। অথচ আল্লাহর সামনে রয়েছে আখেরাত। আর আল্লাহ‌ পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ।

:৬৮

﴿لَّوۡلَا كِتٰبٌ مِّنَ اللّٰهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمۡ فِيۡمَاۤ اَخَذۡتُمۡ عَذَابٌ عَظِيۡمٌ﴾

আল্লাহর লিখন যদি আগেই না লেখা হয়ে যেতো, তাহলে তোমরা যা কিছু করেছো সেজন্য তোমাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হতো।

:৬৯

﴿ فَكُلُوۡا مِمَّا غَنِمۡتُمۡ حَلٰلاً طَيِّبًا‌‌‌ ‌ۖوَاتَّقُوۡا اللّٰهَ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ رَّحِيۡمٌ‏﴾

কাজেই তোমরা যা কিছু সম্পদ লাভ করেছো তা খাও, কেননা, তা হালাল ও পাক-পবিত্র এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। [৪৯] নিশ্চয়ই আল্লাহ‌ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।

:৭০

﴿ يٰۤاَيُّهَا النَّبِىُّ قُل لِّمَنۡ فِىۡۤ اَيۡدِيۡكُمۡ مِّنَ الۡاَسۡرٰٓىۙ اِنۡ يَّعۡلَمِ اللّٰهُ فِىۡ قُلُوۡبِكُمۡ خَيۡرًا يُّؤۡتِكُمۡ خَيۡرًا مِّمَّاۤ اُخِذَ مِنۡكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ‌ؕ وَاللّٰهُ غَفُوۡرٌ رَّحِيۡمٌ‏﴾

হে নবী! তোমাদের হাতে যেসব বন্দী আছে তাদেরকে বলো, যদি আল্লাহ‌ তোমাদের অন্তরে ভাল কিছু দেখেন, তাহলে তিনি তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে তা থেকে অনেক বেশী দেবেন এবং তোমাদের ভুলগুলোর মাফ করে দেবেন। আল্লাহ‌ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।

:৭১

﴿ وَاِنۡ يُّرِيۡدُوۡا خِيَانَتَكَ فَقَدۡ خَانُوۡا اللّٰهَ مِنۡ قَبۡلُ فَاَمۡكَنَ مِنۡهُمۡؕ وَاللّٰهُ عَلِيۡمٌ حَكِيۡمٌ﴾

কিন্তু তারা যদি তোমার সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করতে চায় তাহলে এর আগেও তারা আল্লাহর সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে, কাজেই এরই সাজা আল্লাহ‌ তাদেরকে দিয়েছেন, যার ফলে তারা তোমার করায়ত্ত হয়েছে। আর আল্লাহ‌ সবকিছু জানেন এবং তিনি জ্ঞানী।

:৭২

﴿ اِنَّ الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَهَاجَرُوۡا وَجٰهَدُوۡا بِاَمۡوَالِهِمۡ وَاَنۡفُسِهِمۡ فِىۡ سَبِيۡلِ اللّٰهِ وَالَّذِيۡنَ اَاوَوا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰۤٮِٕكَ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍ‌ؕ وَالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ يُهَاجِرُوۡا مَا لَكُمۡ مِّنۡ وَّلَايَتِهِمۡ مِّنۡ شَىۡءٍ حَتّٰى يُهَاجِرُوۡا‌ۚ وَاِنِ اسۡتَنۡصَرُوۡكُمۡ فِىۡ الدِّيۡنِ فَعَلَيۡكُمُ النَّصۡرُ اِلَّا عَلٰى قَوۡمٍۢ بَيۡنَكُمۡ وَبَيۡنَهُمۡ مِّيۡثَاقٌؕ وَاللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِيۡرٌ‏﴾

যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে নিজের জানমালের ঝুঁকি নিয়ে জিহাদ করেছে আর যারা হিজরতকারীদেরকে আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, আসলে তারাই পরস্পরের বন্ধু ও অভিভাবক। আর যারা ঈমান এনেছে ঠিকই কিন্তু হিজরত করে (দারুল ইসলামে) আসেনি, তারা হিজরত করে না আসা পর্যন্ত তাদের সাথে তোমাদের বন্ধুত্বের ও অভিভাবকত্বের কোন সম্পর্ক নেই। [৫০] তবে হ্যাঁ,, দ্বীনের ব্যাপারে যদি তারা তোমাদের কাছে সাহায্য চায় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের জন্য ফরয। কিন্তু এমন কোন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয় যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে। [৫১] তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ‌ তা দেখেন।

:৭৩

﴿ وَالَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍ‌ؕ اِلَّا تَفۡعَلُوۡهُ تَكُنۡ فِتۡنَةٌ فِىۡ الۡاَرۡضِ وَفَسَادٌ كَبِيۡرٌؕ‏﴾

যারা সত্য অস্বীকার করেছে তারা পরস্পরের সাহায্য সহযোগীতা করে। যদি তোমরা এটা না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি হবে ও বড় বিপর্যয় দেখা দেবে। [৫২]

:৭৪

﴿ وَالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَهَاجَرُوۡا وَجٰهَدُوۡا فِىۡ سَبِيۡلِ اللّٰهِ وَالَّذِيۡنَ اَاوَوا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰۤٮِٕكَ هُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا‌ؕ لَّهُمۡ مَّغۡفِرَةٌ وَّرِزۡقٌ كَرِيۡمٌ﴾

যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর পথে বাড়ি-ঘর ত্যাগ করেছে এবং জিহাদ করেছে আর যারা আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য-সহায়তা করেছে তারাই সাচ্চা মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে ভুলের ক্ষমা ও সর্বোত্তম রিযিক।

:৭৫

﴿ وَالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡۢ بَعۡدُ وَهَاجَرُوۡا وَجٰهَدُوۡا مَعَكُمۡ فَاُولٰۤٮِٕكَ مِنۡكُمۡ‌ؕ وَاُولُوۡا الۡاَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلٰى بِبَعۡضٍ فِىۡ كِتٰبِ اللّٰهِ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيۡمٌۢ‏﴾

আর যারা পরে ঈমান এনেছেও হিজরত করে এসেছে এবং তোমাদের সাথে মিলে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালাচ্ছে তারাও তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আল্লাহর কিতাবে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়গণ পরস্পরের বেশী হকদার। [৫৩] অবশ্যি আল্লাহ‌ সব জিনিস জানেন।