﴿حٰمٓۚ﴾
হা-মীম।
সূরা ৪৫ · মাক্কী
Al-Jathiyah · নতজানু · ৩৭ আয়াত
নামকরণ ২৮ আয়াতের وَتَرَى كُلَّ أُمَّةٍ جَاثِيَةً বাক্যাংশ থেকে এর নাম গৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ এটি সেই সূরা যার মধ্যে ‘জাসিয়াহ’ শব্দ আছে। নাযিল হওয়ার সময়-কাল এ সূরাটির নাযিল হওয়ার সময়-কাল কোন নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়নি। তবে এর বিষয়বস্তু থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় এটি সুরা ‘দুখান’ নাযিল হওয়ার অল্প দিন পরই নাযিল হয়েছে। এ দুটি সূরার বিষয়বস্তুতে এতটা সাদৃশ্য বর্তমান যে সূরা দুটিকে যমজ বা যুগ্ম বলে মনে হয়। বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য এ সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে তাওহীদ ও আখেরাত সম্পর্কে মক্কার কাফেরদের সন্দেহ, সংশয় ও আপত্তির জবাব দেয়া এবং কুরআনের দাওয়াতের বিরুদ্ধে তারা যে নীতি ও আচরণ গ্রহণ করেছে সে সম্পর্কে সতর্ক করা। তাওহীদের সপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করে বক্তব্য শুরু করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মানুষের নিজের অস্তিত্ব থেকে শুরু করে আসমান ও যমীনে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয়েছে, যেদিকেই চোখ মেলে তাকাও না কেন তোমরা যে তাওহীদ মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো প্রতিটি বস্তু তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। নানা রকমের এসব জীব-জন্তু, এই রাতদিন, এই বৃষ্টিপাত এবং তার সাহায্যে উৎপন্ন উদ্ভিদ রাজি, এই বাতাস এবং মানুষের নিজের জন্ম এর সবগুলো জিনিসকে কোন ব্যক্তি যদি চোখ মেলে দেখে এবং কোনো প্রকার গোঁড়ামি বা অন্ধ আবেগ ছাড়া নিজের বিবেক-বুদ্ধিকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে এসব নিদর্শন তার মধ্যে এই দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট যে এই বিশ্ব জাহান খোদাহীন নয় বা এখানে বহু খোদায়ী চলছে না, বরং এক আল্লাহ এটি সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি একাই এর ব্যবস্থাপক ও শাসক। তবে যে ব্যক্তি মানবে না বলে শপথ করেছে কিংবা সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে পড়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার কথা ভিন্ন। দুনিয়ার কোন জায়গা থেকেই সে ঈমান ও ইয়াকীনের সম্পদ লাভ করতে পারবে না। দ্বিতীয় রুকূ’র শুরুতে বলা হয়েছে, এই পৃথিবীতে মানুষ যত জিনিসের সাহায্য গ্রহণ করছে এবং এই বিশ্ব জাহানে যে সীমাসংখ্যাহীন বস্তু ও শক্তি তার স্বার্থের সেবা করছে তা আপনা আপনি কোথাও থেকে আসেনি বা দেব-দেবীরাও তা সরবরাহ করেনি, বরং এক আল্লাহই তাঁর নিজের পক্ষ থেকে তাকে এসব দান করেছেন এবং এসবকে তার অনুগত করে দিয়েছেন। কেউ যদি সঠিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে তার বিবেক-বুদ্ধিই বলে দেবে, সেই আল্লাহই মানুষের প্রতি অনুগ্রহকারী মানুষ তাঁর শোকর গোজারী করবে এটা তাঁর প্রাপ্য। এরপর মক্কার কাফেররা হঠকারিতা, অহংকার, ঠাট্টা-বিদ্রূপ এবং কুফরকে আঁকড়ে ধরে থেকে কুরআনের দাওয়াতের যে বিরোধিতা করছিলো। সে জন্য তাদেরকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছে এবং সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, এ কুরআন সেই নিয়ামত নিয়ে এসেছে যা ইতিপূর্বে বনী-ইসরাঈলদের দেয়া হয়েছিলো যার কল্যাণে বনী ইসরাঈলরা গোটা বিশ্বের সমস্ত জাতির ওপর মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলো। কিন্তু তারা এই নিয়ামতের অমর্যাদা করেছে এবং দ্বীনের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করে তা হারিয়ে ফেলেছে। তাই এখন তা তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এটা এমন একটি হিদায়তনামা যা মানুষের দ্বীনের পরিষ্কার রাজপথ দেখিয়ে দেয়। নিজেদের অজ্ঞতা ও বোকামির কারণে যারা তা প্রত্যাখ্যান করবে তারা নিজেদেরই ধ্বংসের আয়োজন করবে। আর আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের উপযুক্ত বিবেচিত হবে কেবল তারাই যারা এর আনুগত্য করে তাকওয়ার নীতি ও আচরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদের বলা হয়েছে, এসব লোক আল্লাহকে ভয় করে না। এরা তোমাদের সাথে যে অশোভন আচরণ করছে তা উপেক্ষা করো এবং সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো। তোমরা ধৈর্য অবলম্বন করলে আল্লাহ নিজেই এদের সাথে বুঝাপড়া করবেন এবং তোমাদের এই ধৈর্যের প্রতিদান দিবেন। তারপর আখেরাত বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত কাফেরদের জাহেলী ধ্যান-ধারণা আলোচনা করা হয়েছে। কাফেররা বলতোঃ এই দুনিয়ার জীবনই সব। এরপর আর কোন জীবন নেই। যুগের বিবর্তনে আমরা ঠিক তেমনি মরে যাব যেমন একটি ঘড়ি চলতে চলতে বন্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুর পরে রূহের আর কোন অস্তিত্ব থাকে না যে, তা কবজ করা হবে এবং পুনরায় কোন এক সময় এনে দেহে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হবে। তোমরা যদি এ ধরনের দাবি করো তাহলে আমাদের মৃত বাপ দাদাদের জীবিত করে দেখাও। এর জবাবে আল্লাহ একের পর এক কয়েকটি যুক্তি পেশ করেছেন: এক : কোন জ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতে তোমরা একথা বলছো না, বরং শুধু ধারণার ভিত্তিতে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছ। সত্যিই কি তোমাদের জানা আছে যে, মৃত্যুর পরে আর কোন জীবন নেই এবং রূহ কবজ করা হয় না, বরং ধ্বংস হয়ে যায়? দুই : তোমাদের এই দাবীর ভিত্তি বড় জোর এই যে, তোমরা কোন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে দেখোনি। এতটুকু বিষয়ই কি এতবড় দাবি করার জন্য যথেষ্ট যে মৃতরা আর কখনো জীবিত হবে না? তোমাদের অভিজ্ঞতায় ও পর্যবেক্ষণে কোন জিনিস ধরা না পড়ার অর্থ কি এই যে, তোমরা তার অস্তিত্বহীন হওয়ার জ্ঞান লাভ করছো? তিন : এ কথা সরাসরি বিবেক-বুদ্ধি ও ইনসাফের পরিপন্থী যে ভাল ও মন্দ, অনুগত ও অবাধ্য এবং জালেম ও মজলুম সবাইকে শেষ পর্যন্ত একই পর্যায়ভুক্ত করে দেয়া হবে। কোন ভাল কাজের ভাল ফল এবং মন্দ কাজের মন্দ ফল দেখা দেবে না। কোন মজলুমের আর্তনাদ শোনা হবে না কিংবা কোন জালেম তার কৃতকর্মের শাস্তি পাবে না। বরং সবাই একই পরিণাম ভোগ করবে। আল্লাহর সৃষ্টি এই বিশ্ব জাহান সম্পর্কে যে এই ধারণা পোষণ করে সে অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে। জালেম ও দুষ্কর্মশীল লোকদের এ ধারণা পোষণ করার কারণ হলো এই যে, তারা তাদের কাজ-কর্মের মন্দ ফলাফল দেখতে চায় না। কিন্তু আল্লাহর এই সার্বভৌম কর্তৃত্ব কোন অনিয়মের রাজত্ব নয়। এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে সৎ ও অসৎকে এক পর্যায়ভুক্ত করে দেয়ার মত জুলুম কখনো হবে না। চার : আখেরাত অস্বীকৃতির এই আকীদা নৈতিকতার জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। এই আকীদা তারাই গ্রহণ করে যারা প্রবৃত্তির দাস হয়ে আছে। তারা এ আকীদা গ্রহণ করে এ জন্য, যাতে প্রবৃত্তির দাসত্ব করার অবাধ সুযোগ লাভ করতে পারে। কাজেই তারা যখন এ আকীদা গ্রহণ করে তখন তা তাদেরকে চরমতম গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করতে থাকে। এমনকি তাদের নৈতিক অনুভূতি একেবারেই মরে যায় এবং হিদায়াত লাভের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়। এসব যুক্তি-প্রমাণ পেশ করার পর আল্লাহ অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, যেভাবে তোমরা নিজে নিজেই জীবন লাভ করোনি, আমি জীবন দিয়েছি বলে জীবন লাভ করছো, তেমনি নিজে নিজেই মরে যাবে না, বরং আমি মৃত্যু দিই বলে মারা যাও এবং এমন একটি সময় অবশ্যই আসবে যখন তোমাদের সবাইকে যুগপৎ একত্র করা হবে। আজ যদি মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে তোমরা একথা না মানতে চাও তাহলে মেনো না। কিন্তু সে সময়টি যখন আসবে তখন নিজের চোখেই তোমরা দেখতে পাবে যে, তোমরা তোমাদের আল্লাহর সামনে হাজির আছো এবং কোনো প্রকার কমবেশী ছাড়াই তোমাদের পুরো আমলনামা প্রস্তুত আছে, যা তোমাদের প্রতিটি কাজের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সে সময় তোমরা জানতে পারবে আখেরাতের আকীদার এই অস্বীকৃতি এবং এ নিয়ে যে ঠাট্টা-বিদ্রূপ তোমরা করছো এর কত চড়া মূল্য তোমাদের দিতে হচ্ছে।
﴿حٰمٓۚ﴾
হা-মীম।
﴿ تَنۡزِيۡلُ الۡكِتٰبِ مِنَ اللّٰهِ الۡعَزِيۡزِ الۡحَكِيۡمِ﴾
এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যিনি মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী। [১]
﴿ اِنَّ فِىۡ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ لَاٰيٰتٍ لِّلۡمُؤۡمِنِيۡنَؕ﴾
প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মু’মিনদের জন্য আসমান ও যমীনে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। [২]
﴿ وَفِىۡ خَلۡقِكُمۡ وَمَا يَبُثُّ مِنۡ دَآبَّةٍ اٰيٰتٌ لِّقَوۡمٍ يُّوۡقِنُوۡنَۙ﴾
তোমাদের নিজেদের সৃষ্টির মধ্যে এবং যেসব জীব-জন্তুকে আল্লাহ পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার মধ্যে বড় বড় নিদর্শন রয়েছে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণকারী লোকদের জন্য। [৩]
﴿ وَاخۡتِلَافِ الَّيۡلِ وَالنَّهَارِ وَمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ مِنَ السَّمَآءِ مِنۡ رِّزۡقٍ فَاَحۡيَا بِهِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَا وَتَصۡرِيۡفِ الرِّيٰحِ اٰيٰتٌ لِّقَوۡمٍ يَّعۡقِلُوۡنَ﴾
তাছাড়া রাত ও দিনের পার্থক্য ও ভিন্নতার মধ্যে, [৪] আল্লাহ আসমান থেকে যে রিযিক [৫] নাযিল করেন এবং তার সাহায্যে মৃত যমীনকে যে জীবিত করে তোলেন তার মধ্যে [৬] এবং বায়ু প্রবাহের আবর্তনের মধ্যে [৭] অনেক নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা বুদ্ধি-বিবেচনাকে কাজে লাগায়।
﴿ تِلۡكَ اٰيٰتُ اللّٰهِ نَتۡلُوۡهَا عَلَيۡكَ بِالۡحَقِّ ۚ فَبِاَىِّ حَدِيۡثِۭ بَعۡدَ اللّٰهِ وَاٰيٰتِهٖ يُؤۡمِنُوۡنَ﴾
এগুলো আল্লাহর নিদর্শন, যা আমি তোমাদের সামনে যথাযথভাবে বর্ণনা করছি। আল্লাহ ও তাঁর নিদর্শনাদি ছাড়া এমন আর কী আছে যার প্রতি এরা ঈমান আনবে? [৮]
﴿ وَيۡلٌ لِّكُلِّ اَفَّاكٍ اَثِيۡمٍۙ﴾
ধ্বংস এমন প্রত্যেক মিথ্যাবাদী ও দুষ্কর্মশীল ব্যক্তির জন্য
﴿ يَّسۡمَعُ اٰيٰتِ اللّٰهِ تُتۡلٰى عَلَيۡهِ ثُمَّ يُصِرُّ مُسۡتَكۡبِرًا كَاَنۡ لَّمۡ يَسۡمَعۡهَاۚ فَبَشِّرۡهُ بِعَذَابٍ اَلِيۡمٍ﴾
যার সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় এবং সে তা শোনে তারপর পুরো অহংকার নিয়ে কুফরীকে এমনভাবে আঁকড়ে থাকে যেন সে ঐগুলো শোনেইনি। [৯] এ রকম লোককে কষ্টদায়ক আযাবের সুখবর শুনিয়ে দাও।
﴿وَاِذَا عَلِمَ مِنۡ اٰيٰتِنَا شَيۡـًٔۨا اتَّخَذَهَا هُزُوًاؕ اُولٰٓٮِٕكَ لَهُمۡ عَذَابٌ مُّهِيۡنٌؕ﴾
যখন সে আমার আয়াতসমূহের কোন কথা জানতে পারে তখন তা নিয়ে উপহাস ও বিদ্রূপ করে। [১০] এরূপ প্রতিটি ব্যক্তির জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।
﴿ مِّنۡ وَّرَآٮِٕهِمۡ جَهَنَّمُ ؕ وَلَا يُغۡنِىۡ عَنۡهُمۡ مَّا كَسَبُوۡا شَيۡـًٔا وَّلَا مَا اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اَوۡلِيَآءَ ۚ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيۡمٌؕ﴾
তাদের সামনে রয়েছে জাহান্নাম। [১১] তারা পৃথিবীতে যা কিছু অর্জন করেছে তার কোন জিনিসই তাদের কাজে আসবে না আবার আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তারা অভিভাবক বানিয়ে রেখেছেন তারাও তাদের জন্য কিছু করতে পারবে না। [১২] তাদের জন্য রয়েছে বড় শাস্তি।
﴿ هٰذَا هُدًى ۚ وَالَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا بِاٰيٰتِ رَبِّهِمۡ لَهُمۡ عَذَابٌ مِّنۡ رِّجۡزٍ اَلِيۡمٌ﴾
এই কুরআন পুরাপুরি হেদায়াতের কিতাব। সেই লোকদের জন্য কঠিন জ্বালাদায়ক আযাব রয়েছে। যারা নিজেদের রব-এর আয়াতগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার করছে।
﴿ اللّٰهُ الَّذِىۡ سَخَّرَ لَكُمُ الۡبَحۡرَ لِتَجۡرِىَ الۡفُلۡكُ فِيۡهِ بِاَمۡرِهٖ وَلِتَبۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِهٖ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُوۡنَۚ﴾
তিনিই তো আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রকে অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তাঁর নির্দেশে জাহাজসমূহ সেখানে চলে [১৩] আর তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে [১৪] এবং কৃতজ্ঞ হতে পার।
﴿ وَسَخَّرَ لَكُمۡ مَّا فِىۡ السَّمٰوٰتِ وَمَا فِىۡ الۡاَرۡضِ جَمِيۡعًا مِّنۡهُؕ اِنَّ فِىۡ ذٰلِكَ لَاٰيٰتٍ لِّقَوۡمٍ يَّتَفَكَّرُوۡنَ﴾
তিনি যমীন ও আসমানের সমস্ত জিনিসকেই তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন, [১৫] সবই নিজের পক্ষ থেকে। [১৬] এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য বড় বড় নিদর্শন রয়েছে। [১৭]
﴿ قُل لِّلَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا يَغۡفِرُوۡا لِلَّذِيۡنَ لَا يَرۡجُوۡنَ اَيَّامَ اللّٰهِ لِيَجۡزِىَ قَوۡمًۢا بِمَا كَانُوۡا يَكۡسِبُوۡنَ﴾
হে নবী, যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলে দাও, যারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কঠিন দিন আসার আশঙ্কা করে না [১৮] তাদের আচরণ সমূহ যেন ক্ষমা করে দেয় যাতে আল্লাহ নিজেই একটি গোষ্ঠীকে তাদের কৃতকর্মের বদলা দেন। [১৯]
﴿مَنۡ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفۡسِهٖۚ وَمَنۡ اَسَآءَ فَعَلَيۡهَا ثُمَّ اِلٰى رَبِّكُمۡ تُرۡجَعُوۡنَ﴾
যে সৎকাজ করবে সে নিজের জন্যই করবে। আর যে অসৎ কাজ করবে তার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে। সবাইকে তো তার রবের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
﴿ وَلَقَدۡ اٰتَيۡنَا بَنِىۡۤ اِسۡرآءِيۡلَ الۡكِتٰبَ وَالۡحُكۡمَ وَالنُّبُوَّةَ وَرَزَقۡنٰهُمۡ مِّنَ الطَّيِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰهُمۡ عَلَى الۡعٰلَمِيۡنَۚ﴾
ইতিপূর্বে আমি বনী ইসরাঈলদের কিতাব, হুকুম [২০] ও নবুওয়াত দান করেছিলাম। আমি তাদেরকে উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলাম, সারা দুনিয়ার মানুষের ওপর মর্যাদা দান করেছিলাম [২১]
﴿ وَاٰتَيۡنٰهُمۡ بَيِّنٰتٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ ۚ فَمَا اخۡتَلَفُوۡۤا اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَهُمُ الۡعِلۡمُ ۙ بَغۡيًۢا بَيۡنَهُمۡؕ اِنَّ رَبَّكَ يَقۡضِىۡ بَيۡنَهُمۡ يَوۡمَ الۡقِيٰمَةِ فِيۡمَا كَانُوۡا فِيۡهِ يَخۡتَلِفُوۡنَ﴾
এবং দ্বীনের ব্যাপারে স্পষ্ট হিদায়াত দান করেছিলাম। অতঃপর তাদের মধ্যে যে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিলো তা (অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং) জ্ঞান আসার পরে হয়েছিলো এবং এ কারণে হয়েছিলো যে, তারা একে অপরের ওপর জুলুম করতে চাচ্ছিলো। [২২] তারা যেসব ব্যাপারে মতভেদ করে আসছিলো আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেই সব ব্যাপারে ফায়সালা করবেন।
﴿ ثُمَّ جَعَلۡنٰكَ عَلٰى شَرِيۡعَةٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ فَاتَّبِعۡهَا وَلَا تَتَّبِعۡ اَهۡوَآءَ الَّذِيۡنَ لَا يَعۡلَمُوۡنَ﴾
অতঃপর হে নবী, আমি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাকে একটি সুস্পষ্ট রাজপথের (শরীয়তের) ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। [২৩] সুতরাং তুমি তার ওপরেই চলো এবং যারা জানে না তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।
﴿ اِنَّهُمۡ لَنۡ يُّغۡنُوۡا عَنۡكَ مِنَ اللّٰهِ شَيۡـًٔاؕ وَاِنَّ الظّٰلِمِيۡنَ بَعۡضُهُمۡ اَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍ ۚ وَّاللّٰهُ وَلِىُّ الۡمُتَّقِيۡنَ﴾
আল্লাহর মোকাবিলায় তারা তোমরা কোন কাজেই আসতে পারে না। [২৪] জালেমরা একে অপরের বন্ধু এবং মুত্তাকীনদের বন্ধু আল্লাহ।
﴿ هٰذَا بَصَاٮِٕرُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَّرَحۡمَةٌ لِّقَوۡمٍ يُّوۡقِنُوۡنَ﴾
এটা সব মানুষের জন্য দূরদৃষ্টির আলো এবং যারা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে তাদের জন্য হিদায়াত ও রহমত। [২৫]
﴿ اَمۡ حَسِبَ الَّذِيۡنَ اجۡتَرَحُوۡا السَّيِّاٰتِ اَنۡ نَّجۡعَلَهُمۡ كَالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوۡا الصّٰلِحٰتِ ۙ سَوَآءً مَّحۡيَاهُمۡ وَمَمَاتُهُمۡؕ سَآءَ مَا يَحۡكُمُوۡنَ﴾
যেসব [২৬] লোক অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তারা কি মনে করে নিয়েছে যে, আমি তাদেরকে এবং মু’মিন ও সৎকর্মশীলদেরকে সমপর্যায়ভুক্ত করে দেবো যে তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান হয়ে যাবে? তারা যে ফায়সালা করে তা অত্যন্ত জঘণ্য। [২৭]
﴿ وَخَلَقَ اللّٰهُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ وَلِتُجۡزٰى كُلُّ نَفۡسٍۭ بِمَا كَسَبَتۡ وَهُمۡ لَا يُظۡلَمُوۡنَ﴾
আল্লাহ আসমান ও যমীনকে সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টি করেছেন [২৮] এবং এ জন্য করেছেন যাতে প্রত্যেক প্রাণসত্তাকে তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেয়া যায়। তাদের প্রতি কখনো জুলুম করা হবে না। [২৯]
﴿ اَفَرَءَيۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰهَهٗ هٰوٮهُ وَاَضَلَّهُ اللّٰهُ عَلَىٰ عِلۡمٍ وَّخَتَمَ عَلَىٰ سَمۡعِهٖ وَقَلۡبِهٖ وَجَعَلَ عَلٰى بَصَرِهٖ غِشٰوَةًؕ فَمَنۡ يَّهۡدِيۡهِ مِنۡۢ بَعۡدِ اللّٰهِؕ اَفَلَا تَذَكَّرُوۡنَ﴾
তুমি কি কখনো সেই ব্যক্তির অবস্থা ভেবে দেখেছো যে তার প্রবৃত্তির কামনা বাসনাকে খোদা বানিয়ে নিয়েছে [৩০] আর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও [৩১] আল্লাহ তাকে গোমরাহীর মধ্যে নিক্ষেপ করেছেন, তার দিলে ও কানে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং চোখে আবরণ সৃষ্টি করেছেন। [৩২] আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে যে তাকে হিদায়াত দান করতে পারে? তোমরা কি কোন শিক্ষা গ্রহণ করো না? [৩৩]
﴿ وَقَالُوۡا مَا هِىَ اِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنۡيَا نَمُوۡتُ وَنَحۡيَا وَمَا يُهۡلِكُنَاۤ اِلَّا الدَّهۡرُؕ وَمَا لَهُمۡ بِذٰلِكَ مِنۡ عِلۡمٍ ۚ اِنۡ هُمۡ اِلَّا يَظُنُّوۡنَ﴾
এরা বলেঃ জীবন বলতে তো শুধু আমাদের দুনিয়ার এই জীবনই। আমাদের জীবন ও মৃত্যু এখানেই এবং কালের বিবর্তন ছাড়া আর কিছুই আমাদের ধ্বংস করে না। প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাপারে এদের কোন জ্ঞান নেই। এরা শুধু ধারণার বশবর্তী হয়ে এসব কথা বলে। [৩৪]
﴿ وَاِذَا تُتۡلٰى عَلَيۡهِمۡ اٰيٰتُنَا بَيِّنٰتٍ مَّا كَانَ حُجَّتَهُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ قَالُوۡا ائۡتُوۡا بِاٰبَآٮِٕنَاۤ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِيۡنَ﴾
যখন এদেরকে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ শুনানো হয় [৩৫] তখন এদের কাছে এছাড়া আর কোন যুক্তিই থাকে না যে, তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে আমাদের বাপ-দাদাদের জীবিত করে দেখাও। [৩৬]
﴿ قُلِ اللّٰهُ يُحۡيِيۡكُمۡ ثُمَّ يُمِيۡتُكُمۡ ثُمَّ يَجۡمَعُكُمۡ اِلٰى يَوۡمِ الۡقِيٰمَةِ لَا رَيۡبَ فِيۡهِ وَلٰكِنَّ اَكۡثَرَ النَّاسِ لَا يَعۡلَمُوۡنَ﴾
হে নবী, এদের বলো, আল্লাহই তোমাদের জীবন দান করেন এবং তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটান। [৩৭] তিনিই আবার সেই কিয়ামতের দিন তোমাদের একত্রিত করবেন যার আগমনের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। [৩৮] কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানে না। [৩৯]
﴿ وَلِلّٰهِ مُلۡكُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِؕ وَيَوۡمَ تَقُوۡمُ السَّاعَةُ يَوۡمَٮِٕذٍ يَّخۡسَرُ الۡمُبۡطِلُوۡنَ﴾
যমীন এবং আসমানের বাদশাহী আল্লাহর। [৪০] আর যেদিন কিয়ামতের সময় এসে উপস্থিত হবে সেদিন বাতিলপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
﴿ وَتَرٰى كُلَّ اُمَّةٍ جَاثِيَةً كُلُّ اُمَّةٍ تُدۡعَىٰۤ اِلٰى كِتٰبِهَا ؕ الۡيَوۡمَ تُجۡزَوۡنَ مَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ﴾
সে সময় তোমরা প্রত্যেক গোষ্ঠীকে নতজানু দেখতে পাবে। [৪১] প্রত্যেক গোষ্ঠীকে এসে তার আমলনামা দেখার জন্য আহবান জানানো হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যেসব কাজ করে এসেছো তোমাদেরকে তার প্রতিদান দেয়া হবে।
﴿ هٰذَا كِتٰبُنَا يَنۡطِقُ عَلَيۡكُمۡ بِالۡحَقِّؕ اِنَّا كُنَّا نَسۡتَنۡسِخُ مَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ﴾
এটা আমাদের তৈরী করানো আমলনামা, যা তোমাদের বিরুদ্ধে ঠিক ঠিক সাক্ষ্য দিচ্ছে। তোমরা যাই করতে আমি তাই লিপিবদ্ধ করাতাম। [৪২]
﴿ فَاَمَّا الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوۡا الصّٰلِحٰتِ فَيُدۡخِلُهُمۡ رَبُّهُمۡ فِىۡ رَحۡمَتِهٖؕ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡمُبِيۡنُ﴾
যারা ঈমান এনেছিলো এবং সৎকাজ করেছিল তাদের রব তাদেরকে তাঁর রহমতের মধ্যে প্রবেশ করাবেন। এটা সুস্পষ্ট সাফল্য।
﴿ وَاَمَّا الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡۤا اَفَلَمۡ تَكُنۡ اٰيٰتِىۡ تُتۡلٰى عَلَيۡكُمۡ فَاسۡتَكۡبَرۡتُمۡ وَكُنۡتُمۡ قَوۡمًا مُّجۡرِمِيۡنَ﴾
আর যারা কুফরী করেছিলো তাদের বলা হবে আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদেরকে শুনানো হতো না? কিন্তু তোমরা অহংকার করেছিলে [৪৩] এবং অপরাধী হয়ে গিয়েছিলে।
﴿ وَاِذَا قِيۡلَ اِنَّ وَعۡدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّالسَّاعَةُ لَا رَيۡبَ فِيۡهَا قُلۡتُمۡ مَّا نَدۡرِىۡ مَا السَّاعَةُۙ اِنۡ نَّظُنُّ اِلَّا ظَنًّا وَّمَا نَحۡنُ بِمُسۡتَيۡقِنِيۡنَ﴾
আর যখন বলা হতো, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামত যে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তখন তোমরা বলতে, কিয়ামত কী জিনিস তা আমরা জানি না। আমরা কিছুটা ধারণা পোষণ করি মাত্র। দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের নেই। [৪৪]
﴿ وَبَدَا لَهُمۡ سَيِّاٰتُ مَا عَمِلُوۡا وَحَاقَ بِهِمۡ مَّا كَانُوۡا بِهٖ يَسۡتَهۡزِءُوۡنَ﴾
সেই সময় তাদের কাছে তাদের কৃতকর্মের মন্দ ফলাফল প্রকাশ পাবে। [৪৫] তারা সেই জিনিসের পাল্লায় পড়ে যাবে যা নিয়ে তারা বিদ্রূপ করতো।
﴿ وَقِيۡلَ الۡيَوۡمَ نَنۡسٰٮكُمۡ كَمَا نَسِيۡتُمۡ لِقَآءَ يَوۡمِكُمۡ هٰذَا وَمَاۡوٰٮكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِيۡنَ﴾
তাদের বলে দেয়া হবে, আজ আমিও ঠিক তেমনি তোমাদের ভুলে যাচ্ছি যেমন তোমরা এই দিনের সাক্ষাৎ ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের ঠিকানা এখন দোজখ এবং তোমাদের সাহায্যকারী কেউ নেই।
﴿ ذٰلِكُمۡ بِاَنَّكُمُ اتَّخَذۡتُمۡ اٰيٰتِ اللّٰهِ هُزُوًا وَّغَرَّتۡكُمُ الۡحَيٰوةُ الدُّنۡيَا ۚ فَالۡيَوۡمَ لَا يُخۡرَجُوۡنَ مِنۡهَا وَلَا هُمۡ يُسۡتَعۡتَبُوۡنَ﴾
তোমাদের এই পরিণাম এ জন্য যে, তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত করেছিলে এবং দুনিয়ার জীবন তোমাদের ধোকায় ফেলে দিয়েছিলো। তাই আজ এদেরকে দোজখ থেকেও বের করা হবে না কিংবা একথাও বলা হবে না যে, ক্ষমা চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো। [৪৬]
﴿ فَلِلّٰهِ الۡحَمۡدُ رَبِّ السَّمٰوٰتِ وَرَبِّ الۡاَرۡضِ رَبِّ الۡعٰلَمِيۡنَ﴾
কাজেই সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি যমীন ও আসমানের মালিক এবং গোটা বিশ্বজাহানের সবার পালনকর্তা।
﴿ وَلَهُ الۡكِبۡرِيَآءُ فِىۡ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَهُوَ الۡعَزِيۡزُ الۡحَكِيۡمُ﴾
যমীন ও আসমানে তারই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত এবং তিনিই মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী।