﴿كٓهيعٓصٓۚ﴾
কা-ফ্ হা-ইয়া-আই-ন্-সা-দ।
সূরা ১৯ · মাক্কী
Maryam · মারইয়াম · ৯৮ আয়াত
নামকরণ () আয়াত থেকে সূরাটির নাম গ্রহণ করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, এমন সূরা যার মধ্যে হযরত মারিয়ামের কথা বলা হয়েছে। নাযিলের সময়-কাল হাবশায় হিজরতের আগেই সূরাটি নাযিল হয়। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে জানা যায়, মুসলিম মুহাজিরদেরকে যখন হাবশায় শাসক নাজ্জাশীর দরবারে ডাকা হয় তখন হযরত জাফর দরবারে উপস্থিত হয়ে এ সূরাটি তেলাওয়াত করেন। ঐতিহাসিক পটভূমি যে যুগে এ সূরাটি নাযিল হয় সে সময়কার অবস্থা সম্পর্কে সূরা কাহফের ভূমিকায় আমি কিছুটা ইঙ্গিত করেছি। কিন্তু এ সূরাটি এবং এ যুগের অন্যান্য সূরাগুলো বুঝার জন্য এতটুকু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত যথেষ্ট নয়। তাই আমি সে সময়ের অবস্থা একটু বেশী বিস্তারিত আকারে তুলে ধরছি। কুরাইশ সরদাররা যখন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, লোভ-লালসা দেখিয়ে এবং ভয়-ভীতি ও মিথ্যা অপবাদের ব্যাপক প্রচার করে ইসলামী আন্দোলনকে দমাতে পারলো না তখন তারা জুলুম-নিপীড়ন, মারপিট ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার অস্ত্র ব্যবহার করতে লাগলো। প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা নিজ নিজ গোত্রের নওমুসলিমদেরকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতে থাকলো। তাদেরকে বন্দী করে, তাদের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়ে, তাদেরকে অনাহারে রেখে এমনকি কঠোর শারীরিক নির্যাতনের যাঁতাকালে নিষ্পেষিত করে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য বাধ্য করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকলো। এই নির্যাতনে ভয়ংকরভাবে পিষ্ট হলো বিশেষ করে গরীব লোকেরা এবং দাস ও দাসত্বের বন্ধনমুক্ত ভৃত্যরা। এসব মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম কুরাইশদের আশ্রিত ও অধীনস্থ ছিল। যেমন বেলাল (রা.) আমের ইবনে ফুহাইরাহ (রা., , উম্মে ‘উবাইস(রা., , যিন্নীরাহ (রা.) আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রা., ও তাঁর পিতামাতা প্রমুখ সাহাবীগণ। এদেরকে মেরে মেরে আধমরা করা হলো। কক্ষে আবদ্ধ করে খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত করা হলো। মক্কার প্রখর রোদ্রে উত্তপ্ত বালুকারাশির ওপর তাদেরকে শুইয়ে দেয়া হতে থাকলো। বুকের ওপর প্রকাণ্ড পাথার চাপা অবস্থায় সেখানে তারা ঘন্টার পর ঘন্টা কাতরাতে থাকলো। যারা পেশাজীবী ছিল তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে পারিশ্রমিক দেবার ব্যাপারে পেরেশান করা হতে থাকলো। বুখারী ও মুসলিমে হযরত খাব্বাব ইবনে আরতের (রা.) রেওয়ায়াতে বলা হয়েছেঃ “আমি মক্কায় কর্মকারের কাজ করতাম। আস ইবনে ওয়ায়েল আমার থেকে কাজ করিয়ে নিল। তারপর যখন আমি তার কাছে মজুরী আনতে গেলাম, সে বললো, যতক্ষণ তুমি মুহাম্মাদকে (সা.) অস্বীকার করবে না ততক্ষণ আমি তোমার মজুরী দেবো না”। এভাবে যারা ব্যবসা করতো তাদের ব্যবসা নষ্ট করার প্রচেষ্টা চালানো হতো। যারা সমাজে কিছু মান মর্যাদার অধিকারী ছিল তাদেরকে সর্বপ্রকারে অপমানিত ও হেয় করা হতো। এই যুগের অবস্থা বর্ণনা প্রসংগে হযরত খাব্বাব (রা.) বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কা’বার ছায়ায় বসেছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম “হে আল্লাহর রাসূল! এখন তো জুলুম সীমা ছড়িয়ে গেছে, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন না?” একথা শুনে তাঁর পবিত্র চেহারা লাল হয়ে গেলো। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী মু’মিনদের ওপর এর চেয়ে বেশী জুলুম নিপীড়ন হয়েছে। তাদের হাড়ের ওপর লোহার চিরুনী চালানো হতো। তাদেরকে মাথার ওপর করাত রেখে চিরে ফেলা হতো। তারপরও তারা নিজেদের দ্বীন ত্যাগ করতো না। নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, আল্লাহ এ কাজটি সম্পন্ন করে ছাড়বেন, এমনকি এমন এক সময় আসবে যখন এক ব্যক্তি সান’আ থেকে হাদারা মাউত পর্যন্ত নিশ্চিন্তে সফর করবে এবং তার আল্লাহ ছাড়া আর কারোর ভয় থাকবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছো”। (বুখারী) এ অবস্থা যখন সহ্যের সীমা ছড়িয়ে গেলো তখন ৪৫ হস্তী বর্ষে (৫ নববী সন) নবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের বললেনঃ ---------------------------------- “তোমরা হাবশায় চলে গেলে ভালো হয়। সেখানে এমন একজন বাদশাহ আছেন যার রাজ্যে কারো প্রতি জুলুম হয় না। সেটি কল্যাণের দেশ। যতদিন পর্যন্ত না আল্লাহ তোমাদের এ বিপদ দূর করে দেন ততদিন তোমরা সেখানে অবস্থান করবে”। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বক্তব্যের পর প্রথমে এগারো জন পুরুষ ও চারজন মহিলা হাবশার পথে রওয়ানা হন। কুরাইশের লোকেরা সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করে যায়। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে শু’আইবা বন্দরে তাঁরা যথাসময়ে হাবশায় যাওয়ার নৌকা পেয়ে যান। এভাবে তারা গ্রেফতারীর হাত থেকে রক্ষা পান। তারপর কয়েক মাস পরে আরো কিছু লোক হিজরত করেন। এভাবে ৮৩ জন পুরুষ, ১১ জন মহিলা ও ৭ জন অ-কুরাইশী মুসলমান হাবশায় একত্র হয়ে যায়। এ সময় মক্কায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মাত্র ৪০ জন মুসলমান থেকে গিয়েছিলেন। এ হিজরতের ফলে মক্কার ঘরে ঘরে কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়। কারণ কুরাইশদের ছোট বড় পরিবারগুলোর মধ্যে এমন কোন পরিবারও ছিল না যার কোন একজন এ মুহাজিরদের দলভুক্ত ছিল না। কারোর ছেলে, কারোর জামাতা, কারোর মেয়ে, কারোর ভাই এবং কারোর বোন এই দলে ছিল। এই দলে ছিল আবু জেহেলের ভাই সালামাহ ইবনে হিশাম, তার চাচাত ভাই হিশাম ইবনে আবী হুযাইফা ও আইয়াশ ইবনে আবী রাবী’আহ এবং তার চাচাত বোন, হযরত উম্মে সালামাহ, আবু সুফিয়ানের মেয়ে উম্মে হাবীবাহ, উত্বার ছেলে ও কলিজা ভক্ষণকারিণী হিন্দার সহোদর ভাই আবু হুযাইফা এবং সোহাইল ইবনে আমেরের মেয়ে সাহলাহ। এভাবে অন্যান্য কুরাইশ সরদার ও ইসলামের সুপরিচিত শত্রুদের ছেলে মেয়েরা ইসলামের জন্য স্বগৃহ ও আত্মীয় স্বজনদের ত্যাগ করে বিদেশের পথে পাড়ি জমিয়েছিল। তাই এ ঘটনায় প্রভাবিত হয়নি এমন একি গৃহও ছিল না। এ ঘটনার ফলে অনেক লোকের ইসলাম বৈরিতা আগের চেয়ে বেড়ে যায়। আবার অনেককে এ ঘটনা এমনভাবে প্রভাবিত করে যার ফলে তারা মুসলমান হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ হযরত উমরের (রা.) ইসলাম বৈরিতার ওপর এ ঘটনাটিই প্রথম আঘাত হানে। তাঁর একজন নিকট আত্মীয় লাইলা বিনতে হাশ্মাহ বর্ণনা করেনঃ আমি হিজরত করার জন্য নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করছিলাম এবং আমার স্বামী আমের ইবনে রাবী’আহ কোন কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। এমন সময় উমর এলেন এবং দাঁড়িয়ে আমার ব্যস্ততা ও নিমগ্নতা দেখতে থাকলেন।। কিছুক্ষণ পর বললেন, “আবদুল্লাহর মা!চলে যাচ্ছো?” আমি বললাম, “আল্লাহর কসম! তোমরা আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছো। আল্লাহর পৃথিবী চারদিকে উন্মুক্ত, এখন আমরা এমন কোন জায়গায় চলে যাবো যেখানে আল্লাহ আমাদের শান্তি ও স্থিরতা দান করবেন”। একথা শুনে উমরের চেহারায় এমন কান্নার ভাব ফুটে উঠলো, যা আমি তার মধ্যে কখনো দেখিনি। তিনি কেবল এতটুকু বলেই চলে গেলেন যে, “আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন”। হিজরতের পরে কুরাইশ সরদাররা এক জোট হয়ে পরামর্শ করতে বসলো। তারা স্থির করলো, আবদুল্লাহ ইবনে আবী রাবী’আহ (আবু জাহেলের বৈপিত্রেয় ভাই) এবং আমর ইবনে আসকে মূল্যবান উপঢৌকন সহকারে হাবশায় পাঠানো হবে। এরা সেখানে গিয়ে এই মুসলমান মুহাজিরদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠাবার জন্য হাবশার শাসনকর্তা নাজ্জাশীকে সম্মত করাবে। উম্মুল মু’মিনীর হযরত সালামা (রা.) (নিজেই হাবশার মুহাজিরদের দলভুক্ত ছিলেন) এ ঘটনাটি বিস্তারিত আকারে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ কুরাইশদের এই দু’জন কূটনীতি বিশারদ দূত হয়ে আমাদের পিছনে পিছনে হাবশায় পৌঁছে গেলো। প্রথমে নাজ্জাশীর দরবারের সভাসদদের মধ্যে ব্যাপকহারে উপঢৌকন বিতরণ করলো। তাদেরকে এই মর্মে রাযী করালো যে, তারা সবাই মিলে এক যোগে মুহাজিরদেরকে ফিরিয়ে দেবার জন্য নাজ্জাশীর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তারপর নাজ্জাশীর সাথে সাক্ষাত করলো এবং তাকে মহামূল্যবান নযরানা পেশ করার পর বললো, “আমাদের শহরের কয়েকজন অবিবেচক ছোকরা পালিয়ে আপনার এখানে চলে এসেছে। জাতির প্রধানগণ তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার আবেদন জানাবার জন্য আপনার কাছে আমাদের পাঠিয়েছেন। এই ছেলেগুলো আমাদের ধর্ম থেকে বের হয়ে গেছে। এবং এরা আমাদের ধর্মেও প্রবেশ করেনি বরং তারা একটি অভিনব ধর্ম উদ্ভাবন করেছে”। তাদের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই দরবারের চারদিক থেকে এক যোগে আওয়াজ গুঞ্জরিত হলো “এ ধরনের লোকদেরকে অবশ্যই ফিরিয়ে দেয়া উচিত। এদের দোষ সম্পর্কে এদের জাতির লোকেরাই ভালো জানে। এদেরকে এখানে রাখা ঠিক নয়”। কিন্তু নাজ্জাশী রেগে গিয়ে বললেন, “এভাবে এদেরকে আমি ওদের হাতে সোপর্দ করে দেবো না। যারা অন্যদেশ ছেড়ে আমার দেশের প্রতি আস্থা স্থাপন করেছে এবং এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সাথে আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। প্রথমে আমি এদেরকে ডেকে এই মর্মে অনুসন্ধান করবো যে, ওরা এদের ব্যাপারে যা কিছু বলছে সে ব্যাপারে আসল সত্য ঘটনা কি”! অতঃপর নাজ্জাশী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদেরকে নিজের দরবারে ডেকে পাঠালেন। নাজ্জাশীর বার্তা পেয়ে মুহাজিরগণ একত্র হলেন। বাদশাহর সামনে কি বক্তব্য রাখা হবে তা নিয়ে তারা পরামর্শ করলেন। শেষে সবাই এক জোট হয়ে ফায়সালা করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছেন তাই হুবহু কোন প্রকার কমবেশী না করে তাঁর সামনে পেশ করবো, তাতে নাজ্জাশী আমাদের থাকতে দেন বা বের করে দেন তার পরোয়া করা হবে না। দরবারে পৌঁছার সাথে সাথেই নাজ্জাশী প্রশ্ন করলেন, “তোমরা এটা কি করলে, নিজেদের জাতির ধর্মও ত্যাগ করলে আবার আমার ধর্মেও প্রবেশ করলে না, অন্যদিকে দুনিয়ার অন্য কোন ধর্মও গ্রহণ করলে না?” এর জবাবে মুহাজিরদের পক্ষ থেকে হযরত জা’ফর ইবনে আবু তালেব (রা.) তাৎক্ষণিক একটি ভাষণ দিলেন। এ ভাষণে তিনি প্রথমে আরবীয় জাহেলীয়াতের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক দুষ্কৃতির বর্ণনা দেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি কি শিক্ষা দিয়ে চলেছেন তা ব্যক্ত করেন। তারপর কুরাইশরা নবীর (সা.) আনুগত্য গ্রহণকারীদের ওপর যেসব জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল সেগুলো বর্ণনা করেন এবং সবশেষে একথা বলে নিজের বক্তব্যের উপসংহার টানেন যে, আপনার দেশে আমাদের ওপর কোন জুলুম হবে না এই আশায় আমরা অন্য দেশের পরিবর্তে আপনার দেশে এসেছি”। নাজ্জাশী এ ভাষণ শুনে বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নবীর ওপর যে কালাম নাযিল হয়েছে বলে তোমরা দাবি করেছো তা একটু আমাকে শুনাও তো দেখি। জবাবে হযরত জাফর সূরা মারয়ামের গোড়ার দিকের হযরত ইয়াহ্ইয়া ও হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে সম্পর্কিত অংশটুকু শুনালেন। নাজ্জাশী তা শুনেছিলেন এবং কেঁদে চলছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেলো। যখন হযরত জাফর তেলাওয়াত শেষ করলেন তখন তিনি বললেন, ”নিশ্চিতভাবেই এ কালাম এবং হযরত ঈসা (আ) যা কিছু এনেছিলেন উভয়ই একই উৎস থেকে উৎসারিত। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে ওদের হাতে তুলে দেবো না”। পরদিন আমর ইবনুল আস নাজ্জাশীকে বললো “ওদেরকে ডেকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখুন, ঈসা ইবনে মারয়ামের সম্পর্কে ওরা কি আকীদা পোষণ করে? তাঁর সম্পর্কে ওরা একটা মারাত্মক কথা বলে? নাজ্জাশী আবার মুহাজিরদেরকে ডেকে পাঠালেন। আমরের চালবাজীর কথা মুহাজিররা আগেই জানতে পেরেছিলেন। তারা আবার একত্র হয়ে পরামর্শ করলেন যে, নাজ্জাশী যদি ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে প্রশ্ন করেন তাহলে তার কি জবাব দেয়া যাবে। পরিস্থিতি বড়ই নাজুক ছিল। এ জন্য সবাই পেরেশান ছিলেন। কিন্তু তবুও রসূলুল্লাহর (সা.) সাহাবীগণ এই ফায়সালাই করলেন যে, যা হয় হোক, আমরা তো সেই কথাই বলবো যা আল্লাহ ও তাঁর রসূল শিখিয়েছেন। কাজেই যখন তারা দরবারে গেলেন এবং নাজ্জাশী আমর ইবনুল আসের প্রশ্ন তাদের সামনে রাখলেন তখন জা’ফর ইবনে আবু তালেব উঠে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বললেনঃ ---------------------- “তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল এবং তাঁর পক্ষ থেকে একটি রূহ ও একটি বাণী, যা আল্লাহ কুমারী মারয়ামের নিকট পাঠান”। একথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি তৃণখন্ড তুলে নিয়ে বললেন, ”আল্লাহর কসম! তোমরা যা কিছু বললে হযরত ঈসা তার থেকে এই তৃণখণ্ডের চাইতেও বেশী কিছু ছিলেন না”। এরপর নাজ্জাশী কুরাইশদের পাঠানো সমস্ত উপঢৌকন এই বলে ফেরত দিয়ে দিলেন যে, ”আমি ঘুষ নিই না এবং মুহাজিরদেরকে বলে দিলেন, তোমরা পরম নিশ্চিন্তে বসবাস করতে থাকো”। আলোচ্য বিষয় ও কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু এ ঐতিহাসিক পটভূমির প্রতি দৃষ্টি রেখে যখন আমরা এ সূরাটি দেখি তখন এর মধ্যে সর্ব প্রথম যে কথাটি সুস্পষ্ট হয়ে আমাদের সামনে আসে সেটি হচ্ছে এই যে, যদিও মুসলমানরা একটি মজলুম শরণার্থী দল হিসেবে নিজেদের স্বদেশভূমি ত্যাগ করে অন্যদেশে চলে যাচ্ছিল তবুও এ অবস্থায়ও আল্লাহ তাদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে সামান্যতম আপোস করার শিক্ষা দেননি। বরং চলার সময় পাথেয় স্বরূপ এ সূরাটি তাদের সাথে দেন, যাতে ঈসায়ীদের দেশে তারা ঈসা আলাইহিস সালামের একেবারে সঠিক মর্যাদা তুলে ধরেন এবং তাঁর আল্লাহর পুত্র হওয়ার ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করেন। প্রথম দু’ রুকূ’তে হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) ও হযরত ঈসা (আ) এর কাহিনী শুনাবার পর আবার তৃতীয় রুকূ’তে) সমকালীন অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে হযরত ইবরাহীমের (আ) কাহিনী শুনানো হয়েছে। কারণ এ একই ধরনের অবস্থায় তিনিও নিজের পিতা, পরিবার ও দেশবাসীর জুলুম নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে স্বদেশ ত্যাগ করেছিলেন। এ থেকে একদিকে মক্কার কাফেরদেরকে এ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, আজ হিজরতকারী মুসলমানরা ইবরাহীমের পর্যায়ে রয়েছে এবং তোমরা রয়েছো সেই জালেমদের পর্যায়ে যারা তোমাদের পিতা ও নেতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে গৃহত্যাগী করেছিল। অন্যদিকে মুহাজিরদের এ সুখবর দেয়া হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যেমন স্বদেশ ত্যাগ করে ধ্বংস হয়ে যাননি বরং আরো অধিকতর মর্যাদাশীল হয়েছিলেন তেমনি শুভ পরিণাম তোমাদের জন্য অপেক্ষা করেছে। এরপর চতুর্থ রুকূ’তে) অন্যান্য নবীদের কথা আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে একথা বলাই উদ্দেশ্য যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দ্বীনের বার্তা বহন করে এনেছেন সকল নবীই সেই একই দ্বীনের বার্তাবহ ছিলেন। কিন্তু নবীদের তিরোধানের পর তাঁদের উম্মতগণ বিকৃতির শিকার হতে থেকেছে। আজ বিভিন্ন উম্মতের মধ্যে যেসব গোমরাহী দেখা যাচ্ছে এগুলো সে বিকৃতিরই ফসল। শেষ দু’ রুকূ’তে) মক্কার কাফেরদের ভ্রষ্টতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে এবং কথা শেষ করতে গিয়ে মু’মিনদেরকে এই মর্মে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, সত্যের শত্রুদের যাবতীয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তোমরা জনগণের প্রিয় ভাজন হবেই।
﴿كٓهيعٓصٓۚ﴾
কা-ফ্ হা-ইয়া-আই-ন্-সা-দ।
﴿ ذِكۡرُ رَحۡمَتِ رَبِّكَ عَبۡدَهٗ زَكَرِيَّا ۖۚ﴾
এটি তোমার রবের অনুগ্রহের বিবরণ, [১] যা তিনি তাঁর বান্দা যাকারিয়ার [২] প্রতি করেছিলেন,
﴿ اِذۡ نَادٰى رَبَّهٗ نِدَآءً خَفِيًّا﴾
যখন সে চুপে চুপে নিজের রবকে ডাকলো।
﴿ قَالَ رَبِّ اِنِّىۡ وَهَنَ الۡعَظۡمُ مِنِّىۡ وَاشۡتَعَلَ الرَّاۡسُ شَيۡبًا وَّلَمۡ اَكُنۡۢ بِدُعَآٮِٕكَ رَبِّ شَقِيًّا﴾
সে বললো, “হে আমার রব! আমার হাড়গুলো পর্যন্ত নরম হয়ে গেছে, মাথা বার্ধক্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে; হে পরোয়ারদিগার! আমি কখনো তোমার কাছে দোয়া চেয়ে ব্যর্থ হইনি।
﴿ وَاِنِّىۡ خِفۡتُ الۡمَوَالِىَ مِنۡ وَّرَآءِىۡ وَكَانَتِ امۡرَاَتِىۡ عَاقِرًا فَهَبۡ لِىۡ مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِيًّاۙ﴾
আমি আমার পর নিজের স্বজন-স্বগোত্রীয়দের অসদাচরণের আশঙ্কা করি [৩] এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। (তথাপি) তুমি নিজের বিশেষ অনুগ্রহ বলে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দান করো,
﴿يَّرِثُنِىۡ وَيَرِثُ مِنۡ اٰلِ يَعۡقُوۡبَ وَاجۡعَلۡهُ رَبِّ رَضِيًّا﴾
যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকুব বংশেরও উত্তরাধিকারী হবে। [৪] আর হে পরোয়ারদিগার! তাকে একজন পছন্দনীয় মানুষে পরিণত করো।”
﴿زَكَرِيَّاۤ اِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلٰمٍ اسۡمُهٗ يَحۡيٰىۙ لَمۡ نَجۡعَل لَّهٗ مِنۡ قَبۡلُ سَمِيًّا﴾
(জবাব দেয়া হলো) “হে যাকারিয়া! আমি তোমাকে একটি পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে ইয়াহইয়া, এ নামে কোন লোক আমি এর আগে সৃষ্টি করিনি। [৫]
﴿ قَالَ رَبِّ اَنّٰى يَكُوۡنُ لِىۡ غُلٰمٌ وَّكَانَتِ امۡرَاَتِىۡ عَاقِرًا وَّقَدۡ بَلَغۡتُ مِنَ الۡكِبَرِ عِتِيًّا﴾
সে বললো, “হে আমার রব! আমার ছেলে হবে কেমন করে যখন আমার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং আমি বুড়ো হয়ে শুকিয়ে গেছি?”
﴿قَالَ كَذٰلِكَۚ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَىَّ هَيِّنٌ وَّقَدۡ خَلَقۡتُكَ مِنۡ قَبۡلُ وَلَمۡ تَكُ شَيۡـًٔا﴾
জবাব এলো, “এমনটিই হবে” তোমার রব বলেন, এ তো আমার জন্য সামান্য ব্যাপার মাত্র, এর আগে আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না! [৬]
﴿ قَالَ رَبِّ اجۡعَل لِّىۡۤ اٰيَةًؕ قَالَ اٰيَتُكَ اَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلٰثَ لَيَالٍ سَوِيًّا﴾
যাকারিয়া বললেন, “হে আমার রব! আমার জন্য নিদর্শন স্থির করে দাও।” বললেন, “তোমার জন্য নিদর্শন হচ্ছে তুমি পরপর তিনদিন লোকদের সাথে কথা বলতে পারবে না।”
﴿ فَخَرَجَ عَلٰى قَوۡمِهٖ مِنَ الۡمِحۡرَابِ فَاَوۡحٰٓى اِلَيۡهِمۡ اَنۡ سَبِّحُوۡا بُكۡرَةً وَّعَشِيًّا﴾
কাজেই সে মিহরাব [৭] থেকে বের হয়ে নিজের সম্প্রদায়ের সামনে এলো এবং ইশারায় তাদেরকে সকাল-সাঁঝে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার নির্দেশ দিল। [৮]
﴿يٰيَحۡيٰى خُذِ الۡكِتٰبَ بِقُوَّةٍؕ وَّاٰتَيۡنٰهُ الۡحُكۡمَ صَبِيًّاۙ﴾
“হে ইয়াহইয়া! আল্লাহর কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো।” [৯] আমি তাকে শৈশবেই “হুকুম” [১০] দান করেছি
﴿ وَّحَنَانًا مِّنۡ لَّدُنَّا وَزَكٰوةًؕ وَّكَانَ تَقِيًّاۙ﴾
এবং নিজের পক্ষ থেকে হৃদয়ের কোমলতা [১১] ও পবিত্রতা দান করেছি, আর সে ছিল খুবই আল্লাহভীরু
﴿ وَّبَرًّۢا بِوَالِدَيۡهِ وَلَمۡ يَكُنۡ جَبَّارًا عَصِيًّا﴾
এবং নিজের পিতামাতার অধিকার সচেতন, সে উদ্ধত ও নাফরমান ছিল না।
﴿وَسَلٰمٌ عَلَيۡهِ يَوۡمَ وُلِدَ وَيَوۡمَ يَمُوۡتُ وَيَوۡمَ يُبۡعَثُ حَيًّا﴾
শান্তি তার প্রতি যেদিন সে জন্ম লাভ করে এবং যেদিন সে মৃত্যুবরণ করে আর যেদিন তাকে জীবিত করে উঠানো হবে। [১২]
﴿وَاذۡكُرۡ فِىۡ الۡكِتٰبِ مَرۡيَمَۘ اِذِ انتَبَذَتۡ مِنۡ اَهۡلِهَا مَكَانًا شَرۡقِيًّاۙ﴾
আর (হে মুহাম্মাদ) ! এই কিতাবে মারয়ামের অবস্থা বর্ণনা করো। [১৩] যখন সে নিজের লোকদের থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব দিকে নির্জনবাসী হয়ে গিয়েছিল
﴿فَاتَّخَذَتۡ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ حِجَابًا فَاَرۡسَلۡنَاۤ اِلَيۡهَا رُوۡحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا﴾
এবং পর্দা টেনে তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিল। [১৪] এ অবস্থায় আমি তার কাছে নিজের রূহকে (অর্থাৎ ফেরেশতাকে) পাঠালাম এবং সে তার সামনে একটি পূর্ণ মানবিক কায়া নিয়ে হাযির হলো।
﴿قَالَتۡ اِنِّىۡۤ اَعُوۡذُ بِالرَّحۡمٰنِ مِنۡكَ اِنۡ كُنۡتَ تَقِيًّا﴾
মারয়াম অকস্মাৎ বলে উঠলো, “তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করে থাকো তাহলে আমি তোমার হাত থেকে করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি।”
﴿قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوۡلُ رَبِّكِۖ لِاَهَبَ لَكِ غُلٰمًا زَكِيًّا﴾
সে বললো, “আমি তো তোমার রবের দূত এবং আমাকে পাঠানো হয়েছে এ জন্য যে, আমি তোমাকে একটি পবিত্র পুত্র দান করবো?”
﴿قَالَتۡ اَنّٰى يَكُوۡنُ لِىۡ غُلٰمٌ وَّلَمۡ يَمۡسَسۡنِىۡ بَشَرٌ وَّلَمۡ اَكُ بَغِيًّا﴾
মারয়াম বললো, “আমার পুত্র হবে কেমন করে যখন কোন পুরুষ আমাকে স্পর্শও করেনি এবং আমি ব্যভিচারিনীও নই?”
﴿ قَالَ كَذٰلِكِۚ قَالَ رَبُّكِ هُوَ عَلَىَّ هَيِّنٌۚ وَّلِنَجۡعَلَهٗۤ اٰيَةً لِّلنَّاسِ وَرَحۡمَةً مِّنَّاۚ وَكَانَ اَمۡرًا مَّقۡضِيًّا﴾
ফেরেশতা বললো, “এমনটিই হবে, তোমার রব বলেন, এমনটি করা আমার জন্য অতি সহজ আর আমি এটা এ জন্য করবো যে, এই ছেলেকে আমি লোকদের জন্য একটি নির্দশন [১৫] ও নিজের পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহে পরিণত করবো এবং এ কাজটি হবেই।”
﴿ فَحَمَلَتۡهُ فَانتَبَذَتۡ بِهٖ مَكَانًا قَصِيًّا﴾
মারয়াম এ সন্তানকে গর্ভে ধারণ করলো এবং এ গর্ভসহ একটি দূরবর্তী স্থানে চলে গেলো। [১৬]
﴿ فَاَجَآءَهَا الۡمَخَاضُ اِلٰى جِذۡعِ النَّخۡلَةِۚ قَالَتۡ يٰلَيۡتَنِىۡ مِتُّ قَبۡلَ هٰذَا وَكُنۡتُ نَسۡيًا مَّنۡسِيًّا﴾
তারপর প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর গাছের তলে পৌঁছে দিল। সে বলতে থাকলো, “হায়! যদি আমি এর আগেই মরে যেতাম এবং আমার নাম-নিশানাই না থাকতো।” [১৭]
﴿ فَنَادٰٮهَا مِنۡ تَحۡتِهَاۤ اَلَّا تَحۡزَنِىۡ قَدۡ جَعَلَ رَبُّكِ تَحۡتَكِ سَرِيًّا﴾
ফেরেশতা পায়ের দিক থেকে তাকে ডেকে বললো, “দুঃখ করো না, তোমার রব তোমার নীচে একটি নহর প্রবাহিত করেছেন
﴿وَهُزِّىۡۤ اِلَيۡكِ بِجِذۡعِ النَّخۡلَةِ تُسٰقِطۡ عَلَيۡكِ رُطَبًا جَنِيًّا﴾
এবং তুমি এ গাছের কাণ্ডটি একটু নাড়া দাও, তোমার ওপর তরতাজা খেজুর ঝরে পড়বে।
﴿فَكُلِىۡ وَاشۡرَبِىۡ وَقَرِّىۡ عَيۡنًاۚ فَاِمَّا تَرَيِنَّ مِنَ الۡبَشَرِ اَحَدًاۙ فَقُوۡلِىۡۤ اِنِّىۡ نَذَرۡتُ لِلرَّحۡمٰنِ صَوۡمًا فَلَنۡ اُكَلِّمَ الۡيَوۡمَ اِنۡسِيًّاۚ﴾
তারপর তুমি খাও, পান করো এবং নিজের চোখ জুড়াও। তারপর যদি তুমি মানুষের দেখা পাও তাহলে তাকে বলে দাও, আমি করুণাময়ের জন্য রোযার মানত মেনেছি, তাই আজ আমি কারোর সাথে কথা বলবো না।” [১৮]
﴿ فَاَتَتۡ بِهٖ قَوۡمَهَا تَحۡمِلُهٗؕ قَالُوۡا يٰمَرۡيَمُ لَقَدۡ جِئۡتِ شَيۡـًٔا فَرِيًّا﴾
তারপর সে এই শিশুটি নিয়ে নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে এলো। লোকেরা বলতে লাগলো, “হে মারয়াম! তুমি তো মহা পাপ করে ফেলেছো।
﴿ يٰۤاُخۡتَ هٰرُوۡنَ مَا كَانَ اَبُوۡكِ امۡرَاَ سَوۡءٍ وَّمَا كَانَتۡ اُمُّكِ بَغِيًّا ۖۚ﴾
হে হারুণের বোন! [১৯] না তোমার বাপ কোন খারাপ লোক ছিল, না তোমার মা ছিল কোন ব্যভিচারিনী।” [১৯(ক)]
﴿ فَاَشَارَتۡ اِلَيۡهِؕ قَالُوۡا كَيۡفَ نُكَلِّمُ مَنۡ كَانَ فِىۡ الۡمَهۡدِ صَبِيًّا﴾
মারয়াম শিশুর প্রতি ইশারা করলো। লোকেরা বললো, “কোলের শিশুর সাথে আমরা কি কথা বলবো? [২০]
﴿ قَالَ اِنِّىۡ عَبۡدُ اللّٰهِ اٰتٰٮنِىَؕ الۡكِتٰبَ وَجَعَلَنِىۡ نَبِيًّاۙ﴾
শিশু বলে উঠলো, “আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী করেছেন
﴿وَجَعَلَنِىۡ مُبَارَكًا اَيۡنَ مَا كُنۡتُ وَاَوۡصٰنِىۡ بِالصَّلٰوةِ وَالزَّكٰوةِ مَا دُمۡتُ حَيًّاۖ﴾
এবং বরকতময় করেছেন যেখানেই আমি থাকি না কেন আর যতদিন আমি বেঁচে থাকবো ততদিন নামায ও যাকাত আদায়ের হুকুম দিয়েছেন।
﴿وَّبَرَّۢا بِوٰلِدَتِىۡ وَلَمۡ يَجۡعَلۡنِىۡ جَبَّارًا شَقِيًّا﴾
আর নিজের মায়ের হক আদায়কারী করেছেন, [২০(ক)] এবং আমাকে অহংকারী ও হতভাগা করেননি।
﴿ وَالسَّلٰمُ عَلَىَّ يَوۡمَ وُلِدتُّ وَيَوۡمَ اَمُوۡتُ وَيَوۡمَ اُبۡعَثُ حَيًّا﴾
শান্তি আমার প্রতি যখন আমি জন্ম নিয়েছি ও যখন আমি মরবো এবং যখন আমাকে জীবিত করে উঠানো হবে।” [২১]
﴿ ذٰلِكَ عِيۡسَى ابۡنُ مَرۡيَمَؕ قَوۡلَ الۡحَقِّ الَّذِىۡ فِيۡهِ يَمۡتَرُوۡنَ﴾
এ হচ্ছে মারয়ামের পুত্র ঈসা এবং এ হচ্ছে তার সম্পর্কে সত্য কথা, যে ব্যাপারে লোকেরা সন্দেহ করছে।
﴿ مَا كَانَ لِلّٰهِ اَنۡ يَّتَّخِذَ مِنۡ وَّلَدٍۙ سُبۡحٰنَهٗؕ اِذَا قَضٰٓى اَمۡرًا فَاِنَّمَا يَقُوۡلُ لَهٗ كُنۡ فَيَكُوۡنُؕ﴾
কাউকে সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নয়। তিনি পবিত্র সত্তা। তিনি যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তখন বলেন, হয়ে যাও, অমনি তা হয়ে যায়। [২২]
﴿وَاِنَّ اللّٰهَ رَبِّىۡ وَرَبُّكُمۡ فَاعۡبُدُوۡهُؕ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسۡتَقِيۡمٌ﴾
আর (ঈসা বলেছিল) আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদেরও রব। কাজেই তোমরা তার বন্দেগী করো। এটিই সোজা পথ। [২৩]
﴿ فَاخۡتَلَفَ الۡاَحۡزَابُ مِنۡۢ بَيۡنِهِمۡۚ فَوَيۡلٌ لِّلَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ مَّشۡهَدِ يَوۡمٍ عَظِيۡمٍ﴾
কিন্তু তারপর বিভিন্ন দল [২৪] পরস্পর মতবিরোধ করতে থাকলো। যারা কুফরী করলো তাদের জন্য সে সময়টি হবে বড়ই ধ্বংসকর যখন তারা একটি মহাদিবস দেখবে।
﴿اَسۡمِعۡ بِهِمۡ وَاَبۡصِرۡۙ يَوۡمَ يَاۡتُوۡنَنَا لٰكِنِ الظّٰلِمُوۡنَ الۡيَوۡمَ فِىۡ ضَلٰلٍ مُّبِيۡنٍ﴾
যখন তারা আমার সামনে হাযির হবে সেদিন তাদের কানও খুব স্পষ্ট শুনবে এবং তাদের চোখও খুব স্পষ্ট দেখবে কিন্তু আজ এই জালেমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত।
﴿ وَاَنۡذِرۡهُمۡ يَوۡمَ الۡحَسۡرَةِ اِذۡ قُضِىَ الۡاَمۡرُۘ وَهُمۡ فِىۡ غَفۡلَةٍ وَّهُمۡ لَا يُؤۡمِنُوۡنَ﴾
হে মুহাম্মাদ! যখন এরা গাফেল রয়েছে এবং ঈমান আনছে না তখন এ অবস্থায় এদেরকে সেই দিনের ভয় দেখাও যেদিন ফায়সালা করে দেয়া হবে এবং পরিতাপ করা ছাড়া আর কোন গতি থাকবে না।
﴿اِنَّا نَحۡنُ نَرِثُ الۡاَرۡضَ وَمَنۡ عَلَيۡهَا وَاِلَيۡنَا يُرۡجَعُوۡنَ﴾
শেষ পর্যন্ত আমিই হবো পৃথিবী ও তার সমস্ত জিনিসের উত্তরাধিকারী এবং এ সবকিছু আমারই দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে। [২৫]
﴿ وَاذۡكُرۡ فِىۡ الۡكِتٰبِ اِبۡرٰهِيۡمَ ؕ اِنَّهٗ كَانَ صِدِّيۡقًا نَّبِيًّا﴾
আর এই কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা করো। [২৬] নিঃসন্দেহে সে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ এবং একজন নবী ছিল
﴿ اِذۡ قَالَ لِاَبِيۡهِ يٰۤاَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا يَسۡمَعُ وَلَا يُبۡصِرُ وَلَا يُغۡنِىۡ عَنۡكَ شَيۡـًٔا﴾
(এদেরকে সেই সময়ের কথা একটু স্মরণ করিয়ে দাও) যখন সে নিজের বাপকে বললো, “আব্বাজান! আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করেন, যা শোনেও না দেখেও না এবং আপনার কোন কাজও করতে পারে না?
﴿ يٰۤاَبَتِ اِنِّىۡ قَدۡ جَآءَنِىۡ مِنَ الۡعِلۡمِ مَا لَمۡ يَاۡتِكَ فَاتَّبِعۡنِىۡۤ اَهۡدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا﴾
আব্বাজান! আমার কাছে এমন এক জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসেনি, আপনি আমার অনুসরণ করে চলুন, আমি আপনাকে সোজাপথ দেখিয়ে দেবো।
﴿ يٰۤاَبَتِ لَا تَعۡبُدِ الشَّيۡطٰنَؕ اِنَّ الشَّيۡطٰنَ كَانَ لِلرَّحۡمٰنِ عَصِيًّا﴾
আব্বাজান! আপনি শয়তানের বন্দেগী করবেন না। [২৭] শয়তান তো করুণাময়ের অবাধ্য।
﴿ يٰۤاَبَتِ اِنِّىۡۤ اَخَافُ اَنۡ يَّمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحۡمٰنِ فَتَكُوۡنَ لِلشَّيۡطٰنِ وَلِيًّا﴾
আব্বাজান! আমার ভয় হয় আপনি করুণাময়ের আযাবের শিকার হন কি না এবং শয়তানের সাথী হয়ে যান কি না।”
﴿ قَالَ اَرَاغِبٌ اَنۡتَ عَنۡ اٰلِهَتِىۡ يٰۤاِبۡرٰهِيۡمُۚ لَٮِٕنۡ لَّمۡ تَنۡتَهِ لَاَرۡجُمَنَّكَ وَاهۡجُرۡنِىۡ مَلِيًّا﴾
বাপ বললো, “ইবরাহীম! তুমি কি আমার মাবুদদের থেকে বিমুখ হয়েছো? যদি তুমি বিরত না হও তাহলে আমি পাথরের আঘাতে তোমাকে শেষ করে দেবো। ব্যাস তুমি চিরদিনের জন্য আমার থেকে আলাদা হয়ে যাও।”
﴿ قَالَ سَلٰمٌ عَلَيۡكَۚ سَاَسۡتَغۡفِرُ لَكَ رَبِّىۡٓؕ اِنَّهٗ كَانَ بِىۡ حَفِيًّا﴾
ইবরাহীম বললো, “আপনাকে সালাম। আমি আমার রবের কাছে আপনাকে মাফ করে দেবার জন্য দোয়া করবো। [২৭(ক)] আমার রব আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান।
﴿ وَاَعۡتَزِلُكُمۡ وَمَا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ وَاَدۡعُوۡا رَبِّىۡۖ عَسٰٓى اَلَّاۤ اَكُوۡنَ بِدُعَآءِ رَبِّىۡ شَقِيًّا﴾
আমি আপনাদেরকে ত্যাগ করছি এবং আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকেন তাদেরকেও, আমি তো আমার রবকেই ডাকবো। আশা করি আমি নিজের রবকে ডেকে ব্যর্থ হবো না।”
﴿ فَلَمَّا اعۡتَزَلَهُمۡ وَمَا يَعۡبُدُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِۙ وَهَبۡنَا لَهٗۤ اِسۡحٰقَ وَيَعۡقُوۡبَؕ وَكُلاًّ جَعَلۡنَا نَبِيًّا﴾
অতঃপর যখন সে তাদের থেকে এবং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করতো তাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলো এবং তখন আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকুবের মতো সন্তান দিলাম এবং প্রত্যেককে নবী করলাম।
﴿ وَوَهَبۡنَا لَهُمۡ مِّنۡ رَّحۡمَتِنَا وَجَعَلۡنَا لَهُمۡ لِسَانَ صِدۡقٍ عَلِيًّا﴾
আর তাদেরকে নিজের অনুগ্রহ দান করলাম এবং তাদেরকে দিলাম যথার্থ নাম-যশ। [২৮]
﴿ وَاذۡكُرۡ فِىۡ الۡكِتٰبِ مُوۡسٰٓى اِنَّهٗ كَانَ مُخۡلَصًا وَّكَانَ رَسُوۡلاً نَّبِيًّا﴾
আর এ কিতাবে মূসার কথা স্মরণ করো। সে ছিল এক বাছাই করা ব্যক্তি [২৯] এবং ছিল রাসূল-নবী। [৩০]
﴿ وَنَادَيۡنٰهُ مِنۡ جَانِبِ الطُّوۡرِ الۡاَيۡمَنِ وَقَرَّبۡنٰهُ نَجِيًّا﴾
আমি তাকে তূরের ডান দিক থেকে ডাকলাম [৩১] এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করলাম। [৩২]
﴿ وَوَهَبۡنَا لَهٗ مِنۡ رَّحۡمَتِنَاۤ اَخَاهُ هٰرُوۡنَ نَبِيًّا﴾
আর নিজ অনুগ্রহে তার ভাই হারুণকে নবী বানিয়ে তাকে সাহায্যকারী হিসেবে দিলাম।
﴿وَاذۡكُرۡ فِىۡ الۡكِتٰبِ اِسۡمٰعِيۡلَ اِنَّهٗ كَانَ صَادِقَ الۡوَعۡدِ وَكَانَ رَسُوۡلاً نَّبِيًّاۚ﴾
আর এ কিতাবে ইসমাঈলের কথা স্মরণ করো। সে ছিল ওয়াদা পালনে সত্যনিষ্ঠ এবং ছিল রাসূল-নবী।
﴿ وَكَانَ يَاۡمُرُ اَهۡلَهٗ بِالصَّلٰوةِ وَالزَّكٰوةِ وَكَانَ عِنۡدَ رَبِّهٖ مَرۡضِيًّا﴾
সে নিজের পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের হুকুম দিতো এবং নিজের রবের কাছে ছিল একজন পছন্দনীয় ব্যক্তি।
﴿ وَاذۡكُرۡ فِىۡ الۡكِتٰبِ اِدۡرِيۡسَ اِنَّهٗ كَانَ صِدِّيۡقًا نَّبِيًّاۙ﴾
আর এ কিতাবে ইদরিসের কথা স্মরণ করো। [৩৩] সে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ এবং একজন নবী।
﴿وَرَفَعۡنٰهُ مَكَانًا عَلِيًّا﴾
আর তাকে আমি উঠিয়েছিলাম উন্নত স্থানে। [৩৪]
﴿اُولٰٓٮِٕكَ الَّذِيۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰهُ عَلَيۡهِمۡ مِّنَ النَّبِيّٖنَ مِنۡ ذُرِّيَّةِ اٰدَمَ وَمِمَّنۡ حَمَلۡنَا مَعَ نُوۡحٍ وَّمِنۡ ذُرِّيَّةِ اِبۡرٰهِيۡمَ وَاِسۡرآءِيۡلَ وَمِمَّنۡ هَدَيۡنَا وَاجۡتَبَيۡنَآؕ اِذَا تُتۡلٰى عَلَيۡهِمۡ اٰيٰتُ الرَّحۡمٰنِ خَرُّوۡا سُجَّدًا وَّبُكِيًّا ۩﴾
এরা হচ্ছে এমন সব নবী, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন আদম সন্তানদের মধ্য থেকে এবং যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশধরদের থেকে, আর ইবরাহীমের বংশধরদের থেকে ও ইসরাঈলের বংশধরদের থেকে, আর এরা ছিল তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে আমি সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছিলাম এবং বাছাই করে নিয়েছিলাম। এদের অবস্থা এই ছিল যে, যখন করুণাময়ের আয়াত এদেরকে শুনানো হতো তখন কান্নারত অবস্থায় সিজদায় লুটিয়ে পড়তো।
﴿ فَخَلَفَ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ اَضَاعُوۡا الصَّلٰوةَ وَاتَّبَعُوۡا الشَّهٰوتِ فَسَوۡفَ يَلۡقَوۡنَ غَيًّاۙ﴾
তারপর এদের পর এমন নালায়েক লোকেরা এদের স্থলাভিষিক্ত হলো যারা নামায নষ্ট করলো [৩৫] এবং প্রবৃত্তির কামনার দাসত্ব করলো। [৩৬] তাই শীঘ্রই তারা গোমরাহীর পরিণামের মুখোমুখি হবে।
﴿ اِلَّا مَنۡ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓٮِٕكَ يَدۡخُلُوۡنَ الۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُوۡنَ شَيۡـًٔاۙ﴾
তবে যারা তাওবা করবে, ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের সামান্যতম অধিকারও ক্ষুণ্ন হবে না।
﴿جَنّٰتِ عَدۡنٍ الَّتِىۡ وَعَدَ الرَّحۡمٰنُ عِبَادَهٗ بِالۡغَيۡبِؕ اِنَّهٗ كَانَ وَعۡدُهٗ مَاۡتِيًّا﴾
তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি করুণাময় নিজের বান্দাদের কাছে অদৃশ্য পন্থায় দিয়ে রেখেছেন। [৩৭] আর অবশ্যই এ প্রতিশ্রুতি পালিত হবেই।
﴿ لَّا يَسۡمَعُوۡنَ فِيۡهَا لَغۡوًا اِلَّا سَلٰمًاؕ وَّلَهُمۡ رِزۡقُهُمۡ فِيۡهَا بُكۡرَةً وَّعَشِيًّا﴾
সেখানে তারা কোন বাজে কথা শুনবে না, যা কিছুই শুনবে ঠিকই শুনবে। [৩৮] আর সকাল-সন্ধ্যায় তারা অনবরত নিজেদের রিযিক লাভ করতে থাকবে।
﴿ تِلۡكَ الۡجَنَّةُ الَّتِىۡ نُوۡرِثُ مِنۡ عِبَادِنَا مَنۡ كَانَ تَقِيًّا﴾
এ হচ্ছে সেই জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করবো আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে মুত্তাকীদেরকে।
﴿ وَمَا نَتَنَزَّلُ اِلَّا بِاَمۡرِ رَبِّكَۚ لَهٗ مَا بَيۡنَ اَيۡدِيۡنَا وَمَا خَلۡفَنَا وَمَا بَيۡنَ ذٰلِكَۚ وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّاۚ﴾
হে মুহাম্মাদ! [৩৯] আমি আপনার রবের হুকুম ছাড়া অবতরণ করি না। যা কিছু আমাদের সামনে ও যা কিছু পেছনে এবং যা কিছু এর মাঝখানে আছে তার প্রত্যেকটি জিনিসের তিনিই মালিক এবং আপনার রব ভুলে যান না।
﴿رَّبُّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَمَا بَيۡنَهُمَا فَاعۡبُدۡهُ وَاصۡطَبِرۡ لِعِبَادَتِهٖؕ هَلۡ تَعۡلَمُ لَهٗ سَمِيًّا﴾
তিনি আসমান ও যমীনের এবং এ দূয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে সবকিছুর রব। কাজেই আপনি তার বন্দেগী করুন এবং তার বন্দেগীর ওপর অবিচল থাকুন। [৪০] আপনার জানা মতে তাঁর সমকক্ষ কোন সত্তা আছে কি? [৪১]
﴿ وَيَقُوۡلُ الۡاِنۡسَانُ اَءِذَا مَا مِتُّ لَسَوۡفَ اُخۡرَجُ حَيًّا﴾
মানুষ বলে, সত্যিই কি যখন আমি মরে যবো তখন আবার আমাকে জীবিত করে বের করে আনা হবে?
﴿ اَوَلَا يَذۡكُرُ الۡاِنۡسَانُ اَنَّا خَلَقۡنٰهُ مِنۡ قَبۡلُ وَلَمۡ يَكُ شَيۡـًٔا﴾
মানুষের কি স্মরণ হয় না, আমি আগেই তাকে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না?
﴿ فَوَرَبِّكَ لَنَحۡشُرَنَّهُمۡ وَالشَّيٰطِيۡنَ ثُمَّ لَنُحۡضِرَنَّهُمۡ حَوۡلَ جَهَنَّمَ جِثِيًّاۚ﴾
তোমার রবের কসম, আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে এবং তাদের সাথে শয়তানদেরকেও ঘেরাও করে আনবো, [৪২] তারপর তাদেরকে এনে জাহান্নামের চারদিকে নতজানু করে ফেলে দেবো।
﴿ ثُمَّ لَنَنۡزِعَنَّ مِنۡ كُلِّ شِيۡعَةٍ اَيُّهُمۡ اَشَدُّ عَلَى الرَّحۡمٰنِ عِتِيًّاۚ﴾
তারপর প্রত্যেক দলের মধ্যে যে ব্যক্তি করুণাময়ের বেশী অবাধ্য ও বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল তাকে ছেঁটে বের করে আনবো। [৪৩]
﴿ ثُمَّ لَنَحۡنُ اَعۡلَمُ بِالَّذِيۡنَ هُمۡ اَوۡلٰى بِهَا صِلِيًّا﴾
তারপর আমি জানি তাদের মধ্য থেকে কারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার বেশী হকদার।
﴿ وَاِنۡ مِّنۡكُمۡ اِلَّا وَارِدُهَاؕ كَانَ عَلٰى رَبِّكَ حَتۡمًا مَّقۡضِيًّاۚ﴾
তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে জাহান্নাম অতিক্রম করবে না। [৪৪] এতো একটা স্থিরীকৃত ব্যাপার, যা সম্পন্ন করা তোমার রবের দায়িত্ব।
﴿ ثُمَّ نُنَجِّىۡ الَّذِيۡنَ اتَّقَوا وَّنَذَرُ الظّٰلِمِيۡنَ فِيۡهَا جِثِيًّا﴾
তারপর যারা (দুনিয়ায়) মুত্তাকী ছিল তাদেরকে আমি বাঁচিয়ে নেবো এবং জালেমদেরকে তার মধ্যে নিক্ষিপ্ত অবস্থায় রেখে দেবো।
﴿وَاِذَا تُتۡلٰى عَلَيۡهِمۡ اٰيٰتُنَا بَيِّنٰتٍ قَالَ الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا لِلَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡۤاۙ اَىُّ الۡفَرِيۡقَيۡنِ خَيۡرٌ مَّقَامًا وَّاَحۡسَنُ نَدِيًّا﴾
এদেরকে যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াত শুনানো হয় তখন অস্বীকারকারীরা ঈমানদারদেরকে বলে, “বলো, আমাদের দু’দলের মধ্যে কে ভালো অবস্থায় আছে এবং কার মজলিসগুলো বেশী জাঁকালো?” [৪৫]
﴿وَكَمۡ اَهۡلَكۡنَا قَبۡلَهُمۡ مِّنۡ قَرۡنٍ هُمۡ اَحۡسَنُ اَثَاثًا وَّرِءۡيًا﴾
অথচ এদের আগে আমি এমন কত জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি যারা এদের চেয়ে বেশী সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী ছিল এবং বাহ্যিক শান-শওকতের দিক দিয়েও ছিল এদের চেয়ে বেশী অগ্রসর।
﴿ قُلۡ مَنۡ كَانَ فِىۡ الضَّلٰلَةِ فَلۡيَمۡدُدۡ لَهُ الرَّحۡمٰنُ مَدًّا ۚ حَتّٰٓى اِذَا رَاَوۡا مَا يُوۡعَدُوۡنَ اِمَّا الۡعَذَابَ وَاِمَّا السَّاعَةَؕ فَسَيَعۡلَمُوۡنَ مَنۡ هُوَ شَرٌّ مَّكَانًا وَّاَضۡعَفُ جُنۡدًا﴾
এদেরকে বলো, যে ব্যক্তি গোমরাহীতে লিপ্ত হয় করুণাময় তাকে ঢিল দিতে থাকেন, এমনকি এ ধরনের লোকেরা যখন এমন জিনিস দেখে নেয় যার ওয়াদা তাদের সাথে করা হয়- তা আল্লাহর আযাব হোক বা কিয়ামতের সময়- তখন তারা জানতে পারে, কার অবস্থা খারাপ এবং কার দল দুর্বল!
﴿ وَيَزِيۡدُ اللّٰهُ الَّذِيۡنَ اهۡتَدَوۡا هُدًىؕ وَالۡبٰقِيٰتُ الصّٰلِحٰتُ خَيۡرٌ عِنۡدَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَّخَيۡرٌ مَّرَدًّا﴾
বিপরীত পক্ষে যারা সত্য-সঠিক পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথে চলার ক্ষেত্রে উন্নতি দান করেন [৪৬] এবং স্থায়িত্ব লাভকারী সৎকাজগুলোই তোমার রবের প্রতিদান ও পরিণামের দিক দিয়ে ভালো।
﴿ اَفَرَءَيۡتَ الَّذِىۡ كَفَرَ بِاٰيٰتِنَا وَقَالَ لَاُوۡتَيَنَّ مَالاً وَّوَلَدًاؕ﴾
তারপর তুমি কি দেখেছো সে লোককে যে আমার আয়াতসমূহ মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং বলে, আমাকে তো ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করা হতে থাকবেই? [৪৭]
﴿اَطَّلَعَ الۡغَيۡبَ اَمِ اتَّخَذَ عِنۡدَ الرَّحۡمٰنِ عَهۡدًاۙ﴾
সে কি গায়েবের খবর জেনে গেছে অথবা সে রহমানের থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে রেখেছে?
﴿كَلَّاؕ سَنَكۡتُبُ مَا يَقُوۡلُ وَنَمُدُّ لَهٗ مِنَ الۡعَذَابِ مَدًّاۙ﴾
-কখখনো নয়, সে যা কিছু বলছে তা আমি লিখে নেবো। [৪৮] এবং তার জন্য আযাবের পসরা আরো বাড়িয়ে দেবো।
﴿ وَنَرِثُهٗ مَا يَقُوۡلُ وَيَاۡتِيۡنَا فَرۡدًا﴾
যে সাজ-সরঞ্জাম ও জনবলের কথা এ ব্যক্তি বলছে তা সব আমার কাছেই থেকে যাবে এবং সে একাকী আমার সামনে হাযির হয়ে যাবে।
﴿ وَاتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اٰلِهَةً لِّيَكُوۡنُوۡا لَهُمۡ عِزًّاۙ﴾
এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের কিছু খোদা বানিয়ে রেখেছে, যাতে তারা এদের পৃষ্ঠপোষক হয়। [৪৯]
﴿ كَلَّاؕ سَيَكۡفُرُوۡنَ بِعِبَادَتِهِمۡ وَيَكُوۡنُوۡنَ عَلَيۡهِمۡ ضِدًّا﴾
কেউ পৃষ্ঠপোষক হবে না। তারা সবাই এদের ইবাদতের কথা অস্বীকার করবে [৫০] এবং উল্টো এদের বিরোধী হয়ে পড়বে।
﴿اَلَمۡ تَرَ اَنَّاۤ اَرۡسَلۡنَا الشَّيٰطِيۡنَ عَلَى الۡكٰفِرِيۡنَ تَؤُزُّهُمۡ اَزًّاۙ﴾
তুমি কি দেখো না আমি এ সত্য অস্বীকারকারীদের উপর শয়তানদের ছেড়ে রেখেছি, যারা এদেরকে (সত্য বিরোধিতায়) খুব বেশী করে প্ররোচনা দিচ্ছে?
﴿ فَلَا تَعۡجَلۡ عَلَيۡهِمۡؕ اِنَّمَا نَعُدُّ لَهُمۡ عَدًّاۚ﴾
বেশ, তাহলে এখন এদের উপর আযাব নাযিল করার জন্য অস্থির হয়ো না, আমি এদের দিন গণনা করছি। [৫১]
﴿ ۙيَوۡمَ نَحۡشُرُ الۡمُتَّقِيۡنَ اِلَى الرَّحۡمٰنِ وَفۡدًاۙ﴾
সেদিনটি অচিরেই আসবে যেদিন মুত্তাকীদেরকে মেহমান হিসেবে রহমানের সামনে পেশ করবো
﴿ وَّنَسُوۡقُ الۡمُجۡرِمِيۡنَ اِلٰى جَهَنَّمَ وِرۡدًا﴾
এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত পশুর মতো জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবো।
﴿ لَّا يَمۡلِكُوۡنَ الشَّفَاعَةَ اِلَّا مَنِ اتَّخَذَ عِنۡدَ الرَّحۡمٰنِ عَهۡدًاۘ﴾
সে সময় যে রহমানের কাছ থেকে পরোয়ানা হাসিল করেছে তার ছাড়া আর কারো সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে না। [৫২]
﴿ وَقَالُوۡا اتَّخَذَ الرَّحۡمٰنُ وَلَدًاؕ﴾
তারা বলে, রহমান কাউকে পুত্র গ্রহণ করেছেন-
﴿ لَّقَدۡ جِئۡتُمۡ شَيۡـًٔا اِدًّاۙ﴾
মারাত্মক বাজে কথা যা তোমরা তৈরী করে এনেছো।
﴿ تَكَادُ السَّمٰوٰتُ يَتَفَطَّرۡنَ مِنۡهُ وَتَنۡشَقُّ الۡاَرۡضُ وَتَخِرُّ الۡجِبَالُ هَدًّاۙ﴾
আকাশ ফেটে পড়ার, পৃথিবী বিদীর্ণ হবার এবং পাহাড় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে
﴿ اَنۡ دَعَوۡا لِلرَّحۡمٰنِ وَلَدًاۚ﴾
এজন্য যে, লোকেরা রহমানের জন্য সন্তান থাকার দাবী করেছে!
﴿ وَمَا يَنۡۢبَغِىۡ لِلرَّحۡمٰنِ اَنۡ يَّتَّخِذَ وَلَدًاؕ﴾
কাউকে সন্তান গ্রহণ করা রহমানের জন্য শোভন নয়।
﴿ اِنۡ كُلُّ مَنۡ فِىۡ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ اِلَّاۤ اٰتِىۡ الرَّحۡمٰنِ عَبۡدًا﴾
পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে যা কিছু আছে সবই তাঁর সামনে বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে।
﴿ لَّقَدۡ اَحۡصٰٮهُمۡ وَعَدَّهُمۡ عَدًّاؕ﴾
সবাইকে তিনি ঘিরে রেখেছেন এবং তিনি সবাইকে গণনা করে রেখেছেন।
﴿ وَكُلُّهُمۡ اٰتِيۡهِ يَوۡمَ الۡقِيٰمَةِ فَرۡدًا﴾
সবাই কিয়ামতের দিন একাকী অবস্থায় তাঁর সামনে আসবে।
﴿اِنَّ الَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوۡا الصّٰلِحٰتِ سَيَجۡعَلُ لَهُمُ الرَّحۡمٰنُ وُدًّا﴾
নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে শীঘ্রই রহমান তাদের জন্য অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। [৫৩]
﴿فَاِنَّمَا يَسَّرۡنٰهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الۡمُتَّقِيۡنَ وَتُنۡذِرَ بِهٖ قَوۡمًا لُّدًّا﴾
বস্তুত হে মুহাম্মাদ! এ বাণীকে আমি সহজ করে তোমার ভাষায় এজন্য নাযিল করেছি যাতে তুমি মুত্তাকীদেরকে সুখবর দিতে ও হঠকারীদেরকে ভয় দেখাতে পারো।
﴿وَكَمۡ اَهۡلَكۡنَا قَبۡلَهُمۡ مِّنۡ قَرۡنٍؕ هَلۡ تُحِسُّ مِنۡهُمۡ مِّنۡ اَحَدٍ اَوۡ تَسۡمَعُ لَهُمۡ رِكۡزًا﴾
এদের পূর্বে আমি কত জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি। আজ কি কোথাও তাদের নাম-নিশানা দেখতে পাও অথবা কোথাও শুনতে পাও তাদের ক্ষীণতম আওয়াজ?